বৃহস্পতিবার , ফেব্রুয়ারি ২৭ ২০২০
Home / সাহিত্য / গল্প / ফাহমিদা রিআ’র গল্প “অন্তরে আজ দেখবো”

ফাহমিদা রিআ’র গল্প “অন্তরে আজ দেখবো”

আহ। কি ভালো যে লাগছে বিনুর । কদিনের ক্লান্তি, টেনশন, আতংক, কৌতুহল, সব যেন এক নিমিষে উধাও। গুনে গুনে চব্বিশ বছর পর বিনু দেশে ফিরেছে। ফিরেছে আপন শেকড়ে, আপন মাটিতে। গতকাল যখন দীর্ঘ জার্নি শেষ করে আজন্ম আশৈশব বেড়ে ওঠা পিতগৃহে পা রাখলো তখনও মনটায় একটা দ্বিধা কাজ করছিলো, এভাবে চলে আসাটা ঠিক হলো না হয়তো। পরক্ষনে দুচোখ জুড়ে ভেসে ওঠে একসময়ের প্রিয় প্রাঙ্গন, প্রিয় মুখ। এবং সময়ের অনেকটা পেরিয়ে আসা লুকানো আবেগ।

এতগুলো বছর। দু দুটো যুগ পেরিয়ে গেছে কখন যেন। প্রথম দিকে কিছুটা অভিমান কিছুটা সাংসারিক চাপ। নাকি দুটোই? সময়ের ¯্রােতে ধুয়ে ধুয়ে ক্ষয়ে গেছে অভিমান, সংসারের দায়ও কমেছে দায়িত্ব সেরে। গত বছর একমাত্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র ছেলে আদিত্য লেখাপড়া শেষে চাকুরি নিয়ে কানাডায় পাড়ি জমিয়েছে।
নিজেকে সময় দেবার সময়তো এসেছেই। বিদেশ বিভুঁইয়ে স্বামী সন্তানের রুটিনমাফিক ব্যতি ব্যস্ততায় নিয়ম করে পাল্টেছে ক্যালেন্ডারের পাতা, পাল্টেছে কত ক্যালেন্ডারও। একটু একটু করে করে কখন যে এতটা অবসর বিনুর বরাদ্দে জমা হয়ে গেছে বিনু খেয়ালই করে নি। ইন্টারনেটের জগতটায় রোজকার মত সেদিনও দুপুরের অলস সময়টা ট্যাবের গায়ে আঙুল ঘুরাচ্ছিল বিনু। সাহিত্য পাতার একটা এ্যাডে চোখ আটকে গেল। পুরস্কারের জন্য মনোনীত বইয়ের নামটি। ”বিনু”। অধীর আগ্রহে লেখকের নাম দেখতে গিয়ে হার্টবিট মিস হবার জোগাড়।”বিন”ু নামকরণটির নীচে জ¦লজ¦ল করছে তাহসিন আহমেদ নামটা। প্রচ্ছদে চমৎকার পেন্সিল স্কেচ করা একটি নারীর মুখাবয়ব। মোড়ক উন্মোচন অমর একুশে বইমেলায় দুই ফাল্গুন। একটু কি ভাবান্তর হয় মনে? শান্ত ধীর মন জলাশয়ে কারও ছুঁড়ে দেয়া ঢিলে একটু কি কাঁপন লাগে এই অবেলায়?
সন্ধ্যায় চায়ের টেবিলে বিনুর প্রস্তাবে বিস্ময় নিয়ে তাকালেন শাহেদ।বললেন,
—-দেশে যেতে চাও? সামনে ফেব্রুয়ারীতে? মানে আগামী মাসে?
টিকুজি সরিয়ে টিপট থেকে দু’ কাপে চা ঢালতে ঢালতে খুব স্বাভাবিকতা নিয়ে মাথা ঝাঁকালো বিনু,
—- এত অবাক হবার কি আছে। এতদিন যাই নি বলে যে কখনো যাব না তাতো নয়।
—- তা অবশ্য নয়। তবে আমিতো এখন ছুটি পাবো না।
—- না পেলে কি আর করা। আমি একাই যাব।
শাহেদবেশি কথা বলার লোক নন। শুধু মনে মনে ভাবলেন দীর্ঘ চব্বিশটা বছরে ঘরের মানুষটি কখনো কখনো বড্ড অচেনা মনে হয়।
আর বিনুর ভাবনা তখন ডানা মেলেছে পিছন পানে। ইডেন কলেজ থেকে ছায়ানট। যেতে আসতে প্রায় দেখা হয়ে যায় কালো কোকড়ানো ঝাঁকড়া চুলো কালো ছেলেটির সাথে। নাহ্ তখনো চোখে চোখ কিংবা অন্তরে অন্তর ছোঁয়া জাতীয় কিছু ঘটে নি।তবে মুখ চেনাচিনির একটা ব্যাপার হয়েছিল মাত্র।
বিষয়টা গড়ালো খুব দ্রুত একেবারে রোমান্টিকতার আদলে। প্রথম ফাগুনের অনুষ্ঠান সোহরাওয়ার্দিউদ্যানের খোলা চত্বরে সেবার। সিনিয়র রুবা আপার সাথে বরাবরের মতরবীন্দ্রসংগীত গাইবার পর সবুজ ঘাসে আলগোছে বসতে না বসতে মাইকে এ্যানাউন্সমেন্ট শোনে, বিনুকে আহ্বান জানানো হচ্ছে মঞ্চে যাবার।
তারপর, নতুন অভিজ্ঞতা। গীতিনাট্যের ধারা বিবরনীর নারী ক›ঠদানকারীর মেয়েটি অনুপস্থিত। কিছুক্ষন আগে বিনুর গানের গলায় মোহিত হয়ে আয়োজকরা বিনুকেই শুন্যস্থানের উপযুক্ত মনে করছেন। ব্যস, সেই শুরু। এরপর তাহসিনের যখন যেখানে প্রোগ্রাম বিনুরও কন্ঠ অবধারিত। জুটিতে পরিনত হলো ওরা নারী পুরুষ কন্ঠের ধারা বর্ণনায় শুধু নয়, দ্বৈত আবৃত্তিতে গানেও।
সংস্কৃতি প্রিয় মানুষগুলো ভালোবেসে ফেললো গৌর বণের্র মায়াবী চেহারার বিনুর পাশে অতিশয় চাপা বণের্র সুঠাম দেহী ভরাট কন্ঠের তাহসিনকে। আর চপলা উচ্ছলা বিনু একসময় খেয়াল করলো নিজের ভালোলাগা মন্দলাগা চাওয়া পাওয়া ইচ্ছা অনিচ্ছা সবই বাধা পড়েছে একটি সুতোয়।
সাহিত্যের তুখোড় ছাত্র তাহসিনের লেখা যখন শহরের সব বাঘা বাঘা পত্র পত্রিকায় জয়জয়কার তুলছে ঠিক তখনই বিনুর বাবা এক প্রবাসী পাত্রের প্রপোজালকে লুফে নিয়ে বিনুর অমতের কারনওউদ্ধার করলেন সংগে সংগে।ভার্সিটির আবাসিক ছাত্র তাহসিন নিতান্তই বেকার এক প্রতিদ্বন্দ্বি । শুভাকাঙ্খি বাবা এ নিয়ে বিশেষ চিন্তা না করে বিনুর বিয়ের তোড়জোড় করে ফেললেন দ্রুত এবং সাড়ম্বরেই। দেখতে এসে বিনুর অনামিকায় বাঁধনটাতে দিতে না দিতেই প্রবাসী পাত্রের সময়ের স্বল্পতার কারনে চটজলদি বিয়ের দিনটাও ঠিক হয়ে যায় তখুনি।মাতৃহীনা বিনু বাবার কঠিন মন গলাতে ব্যর্থ হয়ে তাহসিনের সাথে যোগাযোগের সব ধরনের চেষ্টা চালিয়ে বিফল হলো।
নিজের সাথে একটানা যুদ্ধ করে বিনু নিজের ভালোবাসাকেই শীর্ষে স্থান দিয়ে বিয়ের আগের দিন সবার ব্যস্ততার ফাঁক গলিয়ে নিজের দুচারখানা কাপড় চোপড় আর জমানো তিন হাজার একান্ন টাকা নিয়ে পিছন দরজা গলিয়ে বড় রাস্তায় গিয়ে রিকশায় চেপে সোজা জহুরুল হক হলের দুইশ তিন নাম্বার কক্ষে হাজির।ঘন্টা দুয়েক অপেক্ষার পর রুমমেট ফারুখ ক্লাশ শেষে এসে জানালো তাহসিন ক্লাশ থেকে বের হয়েছে অনেক ক্ষন। জরুরী খবরে বাড়ি চলে গেল নাকি।বিনু দিগ¦বিদি¦ক জ্ঞানশুন্য হয়ে ছুটে যায় ষ্টেশনে । বিশাল প্লটফর্মে দাঁড়িয়ে খুব কান্না পায়বিনুর। পাবনা ছাড়া আর কিছুই যে জানা নেই তাহসিনের ঠিকানা। একটার পর একটা ট্রেন আসে, আর যায়। বিনু খেই হারিয়ে ফেলে কোনটায় ওঠে কোথায় গেলে পাবে তার একান্ত মনের মানুষটিকে।ফারুখতো তাহসিনের রুমমেট, নিশ্চয় তাহসিনের গ্রামের ঠিকানা জানে। উর্দ্ধশ^াসে আবারও বেরিয়ে আসে প্লাটফর্ম থেকে । হলে যাবার জন্য রিকশায় ওঠার মুহূর্তে মাথায় আকাশ ভেংগে পড়ে। দুচোখে দেখে হলুদ সর্ষে ক্ষেত। ছোট্ট সুটকেশের হাতলে বিনুর হাতের উপরে বাবার শক্তহাত সাঁড়াশির মত করে ধরা।
না , কোন প্রশ্নবানে জর্জরিত হতে হয়নি বিনুকে বাবার কাছে। পরদিন যথারীতিবিনু তিন কবুল বলে বাবার সঁপে দেয়া স¦ামীর হাত ধরে শ^শুরের ভিটায় গেছে। যদিও একমাত্র মামাশ^শুর ছাড়া আপনজন কেউ ছিল না সেখানে। শফিকের এর হাতে সঁপে দেয়ার সময়রাশভারী বাবা শীতল কন্ঠে শুধু বললেন, জন্মদাতা পিতার সম্মানটুকু রেখো শুধু,বাবাকে ভালোবাসতে না পারলেও।
কদিন পর ফিরানিতে এলে বাবা শফিককে সরাসরি বলে দিলেন, যত দ্রুত সম্ভব নিজ কর্মস্থলে বিনুকে নিয়ে যাবার কাগজ তৈরি করতে। বিয়ের পর মেয়েদের জন্য পিতৃগৃহ বেমানান। পড়াশুনা করতে চাইলে সব জায়গাতেই সম্ভব, প্রবাসেও।
স্বল্পকথার জামাই মানুষটির এতে কিছু প্রতিক্রিয়া হয়েছিল কিনা বুঝা না গেলেও বিনু ভালোভাবেই বুঝেছিল বাবা তার উপর থেকে সবটুকু ভরসা হারিয়ে ফেলেছেন।
বিনুর অভিমানগুলো বরফ হয়ে জমাট বাধে মন গহীনে। তাহসিন বিষয়টা কিভাবে নিয়েছে মাঝে মাঝে খুব অস্থির লাগতো বিনুর। ভাবতো ও কি আর আবৃত্তি করবে বিনুকে ছাড়া? গাইতে পারবে গান? ডায়াসে যুগল কন্ঠের আবহ বর্ণনা আর কোনদিনও কি সম্ভব?
বিনু খুঁজে ফিরে তাহসিনকে। বিদায়বেলায় একটিবার দেখা পেতে। পরিচিত সবখানে। চেনা পথে অশান্ত মনকে নিয়ে সেই সবুজ দূর্বা ঘাসের কার্পেট মাড়িয়ে, বৃক্ষ সারির ছায়াতল দিয়ে। কড়ই কৃষ্ঞচূড়ার বেদীতে বেদীতে।। অন্তরে অনুরণিত হতে থাকে, ”আমি তোমারও সংগে বেঁধেছি আমারও প্রাণ সুরের বাঁধনে তুমি জানো না আমি তোমারে পেয়েছি অজানা সাধনে….”
হঠাৎ ঝাঁকুনি মনে, দেহেও। এমব্যাসি থেকে বাবার সাথে ফেরার পথে যানজটে অপেক্ষমান গাড়িতে বসে বসে সে পরিস্কার শুনতে পেল কোত্থেকে ভেসে আসা গমগমে কন্ঠের স্পষ্ট উচ্চারণ। কানে এলো,তাহসিনের কন্ঠ সাথে কন্ঠ মিলিয়ে কে যেন কবিতার ¯িœগ্ধতায় ছড়িয়ে চলেছে
”অন্তর মম বিকশিত করো
অন্তরতর তর হে
নির্মল করো ,উজ্জ্বল করো
সুন্দর কর হে”
মাথার দুপাশের রগের প্রচন্ড দাপাদাপিতে চোখ বুজে ফেলে বিনু। তাহসিনের জগতটা তেমনি আছে। কোথাও তাল কাটেনি বিনুকে হারিয়ে। পাল্টে যায় নিকিছুই। ফাঁকা ফাঁকা লাগেনি চারপাশ। মাথার দুপাশে দপ দপ করতে থাকে রগ দুটো। দু আঙুলে মাথা চেপে ডুকরে কেঁদে ওঠে বিনু। পাশে বসা বাবার হাতের স্পর্শ অনুভব করে মাথায়।

ধীরে ধীরে মনকে বাগে আনে বিনু। কেউ চলে গেলে শুন্যতাতো পুরন হতেই হবে। এই কি ভালো নয়?

এরপর আর খোঁজা নয়। বিদায় নিবে কার কাছে বিনু যার কিনা শুন্যস্থান পুরন করতে তিন মাসও লাগে না। নিরবে নিঃশব্দে কাটে নির্ধারিত সময়। সূর্যোদয় সূর্যাস্তের দিন রাত গুনে গুনে অবশেষে বিনু উড়াল দেয়সাত সমুদ্রের ওপারে। কোন দুঃখবোধ যেমন গ্রাস করেনি, উচ্ছলতাও যোগায়নি কোন খুশির।
সংসার সন্তান নিয়ে গতানুগতিক জীবনের গভীর থেকে গভীরে হারিয়ে গেছে সময়ের অনেকটাই। প্রবাসী হবার কিছুদিন পরই বাবা বিদায় নেয়ার কারনেই হোক কিংবা পিছুটানের অভাবই হোক বিনুরা কেউ আর নিজ দেশে আসার কথা মনে আনেনি। মেঘে মেঘে বেলা ফুরোনো যেন।
চব্বিশ বছর কম সময়তো নয়। পৈত্রিক বাড়িটায় ছোট চাচার কাছেই
উঠেছে বিনু। নষ্টালজিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে পদে পদে। জেট ল্যাগের কবলে
ঘুম ঘুম আমেজটা দুহাতে সরিয়ে দেয়ালে টাঙানো ঘড়িটায় চোখ রাখে
বিনু। শুক্রবারের সকাল। ন ’টা বাজে প্রায়। দশটায় অনুষ্ঠান। ”বিনু”র মোড়ক উন্মোচন। নিজের মনেই হাসে নিজের পাগলামীতে। বলা নেই কওয়া নেই এতকাল পর এ কেমন ইচ্ছে? মনের গহীনে ঘাপটি মেরে বসে থাকা এ কোন সাধের জের? নাকি তার একসময়ের ভালোবাসার মানুষটি এখনও যে তাকে লালন করে চলেছে এই আত্ম অহমিকায় কিছুটা অহংকারী হয়ে ছুটে এসেছে।
বাসন্তি রঙা জমিনে জরি পেড়ে তাঁতের শাড়িটি যতœ করে গায়ে জড়ালো বিনু। আয়নায় দেখা নিজের মেদবহুল কোমর ছাপিয়ে সেই তন্বিছিপছিপে নিজেকে দেখতে পাচ্ছে যেন। কপালে লাল টিপটা বসিয়ে চুলগুলি নিয়ে একটু ভাবলো । চাইলেই কি আর সব পাওয়া যায়? পিঠ জুড়ে থাকা লম্বা বিনুনীটা সেই কবেই নেই হয়ে গেছে। আলগোছে স্বল্প চুলগুলিকে হাত খোপায় জড়িয়ে রূপার কাঁটাটা গুজে নেয় । হাত ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে ছোট্ট হিলে টুকটুক শব্দ তুলে ভাবে এগিয়ে যাবে আজ সে পিছন পানে। আবারো হাসি পায় বিনুর নিজের কথায়।
আসলে বহু কাল পর সে যেন আজ ফিরে পেয়েছে পুরনো আকাশ বাতাস চারপাশের সব সব কিছু। অনতিদূরের মঞ্চ থেকে ভেসে আসছে ,হ্যালো হ্যালো ওয়ান ট ুথ্রি ফোর…………
তাড়া নেই বিনুর এখন। সামনের কড়ই তলায় গিয়ে বসে। এই চাতাল যে কত রিহার্সেলের সাক্ষী।
মাইকে অনুষ্ঠান শুরুর কথা ভেসে আসছে। সামনের সারিগুলো সব ভরা। মাঝামাঝির ফাঁকা আসনটায় এসে বসে বিনু সামনে দৃষ্টি ছুঁড়ে দেয়। উঁচু মঞ্চের ব্যাক কভারে বিশাল প্রচ্ছদে ”বিনু”।সেদিক তাকিয়ে সচকিত হয় এবার বিনু। হ্যা ঐতো মঞ্চে উপবিষ্ট তাহসিন গুনিজনদের সাথে। ঝাকড়া চুলগুলো পরিমানে কমে গেছে অনেকটাই। হাল্কা চুল কাঁচা পাকায় মিশেল। চোখের চশমাও ওঠেছে। মেঘে মেঘে বেশ বেলাইতো বয়ে গেছে। এতগুলো বছরে প্রকৃতির বদলে যাওয়া এতটুকুই। বিনুকেও কি তাহসিন এমনি এক পলকেই চিনে ফেলবে? কিজানি।
ভাবনার ছেদ ঘটিয়ে সঞ্চালকের মায়াবী উচ্চারণে উপস্থাপিত হতে থাকে চমৎকার উপমার বয়ানে নতুন বই ”বিনু’। তাহসিন আহমেদের বিনু।
এ বই এর পাতায় পাতায় বিনুর ছোঁয়া। প্রচ্ছদে,উৎসর্গে, এবং পুরো গল্প জুড়েই। গল্পের ও গল্প থাকে। সেই গল্পটাই বলবেন এখন গল্পকার নিজেই। সঞ্চালক এসে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড় করিয়ে দিলেন তাহসিনকে। সেই হাসি, সেই ভরাট কন্ঠ। বলে চলেছে……..সময়টা চব্বিশ বছর আগের । সদ্য সকাল পেরুনো কোন এক সাত জুলাই। ছেলেটি ভার্সিটিতে যায় , ক্লাশ করে বের হয় প্রতিদিনের মতই। হলের কাছাকাছি আসতেই অপরিচিত কজন পথ রোধ করে। শহর ছেড়ে চলে যেতে বলে। প্রতিবাদ করলে মাথায় আঘাত করে পালিয়ে যায় ওরা। ছেলেটি ঘটনার আকস্মিকতায় লুটিয়ে পড়ে ওখানেই। ঠিক সেসময় ফিরছিলো মেয়েটি ভাইয়ের সাথে গানের রির্হাসেল করে।
দূর থেকেই চিনতে পারে ক্যাম্পাসের প্রিয় মুখ গুনী আবৃত্তিকার গায়ক এবং কবিকে। ছুটে এসে স্কুটারে তুলে মেডিক্যালে নিয়ে যায় তাকে অচেতন আর রক্তাক্তু অবস্থায়। চেতন ফিরলে অস্ফুটে শুধু দুঠোঁটে উচ্চারিত হয় একটি নাম।
ডাক্তার জানান, অতর্কিতে মাথার আঘাতটা গুরুতর হওয়ায় চোখের টিসুগুলি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। দৃষ্টিশক্তির জন্য জরুরীভাবে অপারেশন প্রয়োজন।
ছেলেটি বিধবা মায়ের একমাত্র সন্তান হওয়ায় পারিবারিকভাবে এগিয়ে আসার কেউ ছিল না। ভাইবোনের মধ্যবিত্ত পরিবারটি ছেলেটির মায়ায় কাছ ছাড়া হলো না আর।
বন্ধুদের নিয়ে ঘুরলো পথে পথে।ওরা অসুস্থ ছেলেটির আবৃত্তি আর গানের রেকর্ড বাজিয়ে সংগ্রহ করলো অর্থ। বছর খানেক লাগলো স্বাভাবিকতা ফিরে পেতে ছেলেটির। কিন্তু চোখের আলো ফিরে এলো না। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো ছেলেটি সেই যে শুরু তে একটি নাম উচ্চারণ করেছিল অস্বাভাবিক এবং স্বাভাবিক সব সময়ই সে ঐ নামে ডাকতো। সেইনামটি হলো ”বিনু”। পরবর্তীতে সেদিনের সেই ছেলেটির জীবনসাথী মানে আমার জীবনসাথী । যার চোখের আলোয় লেখা আমার আজকের এই বই। ইনিই সেই বিনু।
তাহসিন এ পর্যন্ত বলে হাত বাড়ালো সামনে।দর্শক সারি থেকে মঞ্চে উঠে এলো এক হাস্যোজ্জ্বল মুখ। পরনে সমুদ্র নীল শাড়ি। এলো খোঁপায় গোঁজা আধ ফোটা সাদা গোলাপ। দুহাত বাড়িয়ে দিয়ে তাহসিনের বাড়িয়ে দেয়া হাতটি সযতনে আঁকড়ে এগিয়ে নিয়ে এসে বসিয়ে দিল নির্ধারিত আসনে।
অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে সাংস্কৃতিক পর্ব।
দর্শক সারি থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে চব্বিশ বছর আগের এক বিনু। যার অস্তিত্ব এখানকার কেউ জানে না । জানবেও না। যে আগ্রহ আর কৌতুহল নিয়ে বিনু ঘন্টা দুয়েক আগেও অধীর হয়ে প্রহর গুনছিল মুহূর্তে তা যেন মিইয়ে গেল একটি ফু তে।তাহসিনের গল্পে উল্লেখিত তারিখটি ছিল সাত জুলাই, তার বিয়ের ঠিক আগের দিন। আর অপরিচিত জনগুলো যে তার বাবার ভাড়া করা সনত্রাসী ছিল তা বুঝতে বাকী রইলো না। তাহসিনের চোখের আলো নিভিয়ে মেয়ের সংসারে আরো জা¦লতে চেয়েছেন তার ই বাবা। হা আফসোস।
পায়ে পায়ে অনেকটাই পিছনে ফেলে এসেছে বিনু মুল অনুষ্ঠান। ভেসে আসা সুরে থমকে দাঁড়ায় হঠাৎ। পিছনে না তাকিয়েও অনভব করে মুখ দুটি , যারা কন্ঠে কন্ঠ মিলিয়ে গাইছে,
”চোখের আলোয় দেখেছিলেম
চোখের বাহিরে
অন্তরে আজ দেখবো
যখন আলোক নাহি রে”…………

পোষ্টটি 403বার পঠিত

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন

Check Also

ভালোবাসা নিয়ে বিখ্যাত লেখকদের উক্তি

বাংলাবাজার২১ : ভালোবাসা নিয়ে বিভিন্ন সময় বিশ্বের সেরা লেখকরা বিভিন্ন রকম উক্তি দিয়েছেন। শেক্সপিয়ার থেকে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *