বৃহস্পতিবার , ফেব্রুয়ারি ২৭ ২০২০
Home / সাহিত্য / গল্প / ফাহমিদা রিআ’র গল্প “জীবনের বাঁকে”

ফাহমিদা রিআ’র গল্প “জীবনের বাঁকে”

সামনের সোফাটায় গা এলিয়ে অপেক্ষার প্রহর পার করতে বসলো নিলয়। আরও দু একটা এয়ার লাইনের
যাত্রীরাও ততক্ষণে ভীড় বাড়াতে শুরু করেছে। অথচ লাগেজ আসবার তখনও কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
সেবারও এমন সময় পার করেছিল নিলয় এখানে বসে বসে। মায়ের পাঠানো তরীর ছবিটা  বার কয়েক দেখেও
ছিল আগামীর স্বপ্নজাল বুনতে বুনতে। আজও অনেকটা তেমনই, শুধু ছবিটা সংগে নেই। কর্ণকুহরে আছে তরীর
কথামালা।

নতুন ঢাউস সুটকেশটা খুলে বিয়ের বাজারগুলি একটা একটা করে যখন সেবার মার হাতে তুলে দিচ্ছিল নিলয়,
মা গভীর আগ্রহ নিয়ে  দেখছিলেন আর বলছিলেন,  খুব মানাবে এসব তরীকে। ফুটফুটে গায়ের রঙ আর মিষ্টি
চেহারার কথা বারবারই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে শোনাচ্ছিলেন নিলয়কে।
নিলয়ের মন্দ লাগছিল না। সেই ছেলেবেলার অভ্যেস মার পছন্দই ওর পছন্দ। ভার্সিটিতে পড়ার সময়ও ঈদ বা
অন্য কোন উৎসবে জামাটা জুতোটা মাকে সংগে নিয়েই কিনেছে নিলয়। একার উপর কেমন যেন ভরসা পায় না
আজোবধি।
ছুটিছাটার ঝামেলা সামলে বিশ   দিনের ছুটিটা ম্যানেজ করে এলো নিলয় বিয়ের আগের  দিনই। মেয়েপক্ষেরও
আপত্তি  ছিল না তাতে।  দেখা দেখির   পালাটা অভিভাবক পর্যায়ে বহু আগেই  হয়ে ছিল। কিন্তু যাদের নিয়ে
আয়োজন তারাই দুজন দুজনকে  দেখি নি। নিলয়  ধরেই নিয়েছিল কনেটি তার মতই  মন মানসিকতার।
অভিভাবক নির্ভর।ভেবে আনন্দও পেয়েছিল। মনের মিলটা হবে বটে।
আসলে জীবনটা যে অতটা সহজ নয় টের পেয়েছিল নিলয় তার পঁচিশ বছরের জীবনে প্রথম সেদিন,যেদিন ফুলে
আচ্ছাদিত বাসর ঘরে তরীর ঘোমটা সরানোর আগেই তরী নিজেই নিলয়ের মুখোমুখি  হয়েছিল।  হাতদুটো ধরে
অনুনয়ে ভেঙে পড়েছিল। পরিষ্কার উচ্চারনে বলেছিল, সে রাজুকে ভালোবাসে। বাবা তাকে মানতে নারাজ। কদিন
আগে একটা স্ট্রোক হয়ে বাবাকে বাঁচাতে গিয়ে সে এই বিয়েতে নাম মাত্র রাজি হয়েছে।
নিলয় বিন্দু মাত্র না ঘাবড়িয়ে বলেছে, হতেই পারে। প্রথম জীবনের ভালোবাসাগুলি আবেগ চালিত। বাস্তবের
সংস্পর্শে এলে আবেগ উড়াল  দেয়। কলেজ জীবনে তারওতো অনেককেই ভালো লাগতো। কিন্তু সব রেশ  ধুয়ে
মুছে ঠাঁই তৈরি করে রেখেছে নতুন কাঙ্খিত মানুষটির জন্য।
তরী এসবের ধারে কাছেও গেলো না। বলে চললো একটানা ওর নিজের কথা। নিজের আগামীর কথা।
নিলয়ের ছাড়পত্র তার প্রয়োজন। এই ছাড়পত্র   দেখিয়ে  সে রাজুকে বিয়ে করতে চায়।
নিলয় অবাক নাকি বিস্ময়ে অনুভুতিহীন হয়ে
যাওয়া মাথায় বাজ পড়া কথাগুলি সামাল দিলো প্রথমটায়।
না, বজ্রাহত নিলয় প্রথমটায় বাকহীন হয়ে গেলেও বিমুঢ় হয়ে যায় নি।
হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বিস্ময়ে তাকিয়েছিল শুধু।

আর তরী ঐ বিস্ময়ের চাহনী ডিঙিয়ে একটানা বলে  যাচ্ছিল সমস্যার মন গড়া  সমাধান। নিলয় কিছু
শুনছিল,কিছু শুনছিল না। মাথায় অসহনীয় একটা অস্বস্তি আঘাত করছিল শুধু।  অনর্গল কথা বলে যাওয়া
তরীকে একসময় স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল না  নিলয়ের। অতি উত্তজনার ঘোর লাগা অস্বাভাবিক একটি আলুথালু
বেশের মানুষ মনে হচ্ছিল। দুচোখে আঁকা কাজল ধোয়া পানি গড়াতে গড়াতে ফর্সা গাল দুটোতে দাগ এঁকে
দিয়েছিল লোনা পানির। লাল রাঙা টুকটুকে  অধরে শুষ্ক আভা। নির্ঘুম চোখ দুটির অসহায়ত্ব হঠাৎ করেই তরীর
জন্য করুণা জাগিয়েছিল নিলয়ের মনে।
হঠাৎ হাত ওঠিয়ে তরীকে থামতে ইশারা করে প্রথম কথাটি জানায়,
—— আমার করনীয়টা কি?
যেন এমনটাই আশা ছিল তরীর। বড় একটা শ্বাস নিয়ে অকপটে বলে ওঠলো—- মুক্তি। আমাকে মুক্ত করে দিন
প্লিজ।
—– কিভাবে?
—– কাগজে কলমে সম্পর্কটা ছিন্ন করে।
নিলয় মাথা নাড়ে।
—- বেশ। তাই হবে।
বিধ্বস্ত ক্লান্ত চেহারাটি মুহূর্তেই উজ্জ্বল হয়ে ওঠে তরীর।
কাল  দুপুরে বৌভাত শেষে ফিরানি নিতে আসবে আমাদের বাড়ি থেকে। আমার সাথে আপনি নিশ্চয় যাবেন না ও
বাড়িতে। এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কাগজপত্র গুলি পাঠিয়ে দিবেন।
বিশ্বাস করেন আমি আপনার এই মহানুভবতার কথা জীবনেও ভুলবো না।
নিলয় কিছু একটা বলতে গিয়েও নিজেকে সামলে নেয়।
পরদিন সব চলে নিয়ম মাফিক। সুরভিত বেলি আর গোলাপের ঝালর থেকে একটা দুটো করে ঝরে পড়তে থাকে
ফুলেরা। এ্যাপয়েন্টমেন্ট অনুযায়ী নিলয়ের বোনদের সাথে পার্লারে যায় তরী ঠোঁটে আলগা লাজ মাখা হাসি নিয়ে।
কমিউনিটি সেন্টারের মঞ্চে কণের সাজে বসে বিশাল কারুকাজ  খচিত ওড়নায় ঘোমটা ঢেকে। পরণে জ্বলজ্বল
করে ঝকমকে পাথরে কারুকাজ করা শাড়ী। গা ভরা গহনার ঔজ্জ্বলে তরীর গত রাতের বিষাদময়তা ঢেকে যায়।
রেশমি পান্জাবী, চুড়িদার পাজামা আর চমৎকার জয়পুরী পাদুকায়  রিসেপশনে দাঁড়ানো  নিলয়  স্বজনদের
আব্দারে মাঝে মাঝে তরীর পাশে এসে বসে, ফটো সেশনে অংশ নেয়। আড় চোখে তরীর নিখুঁত অভিনয়  দেখে।
কখনো চোখে চোখও পড়ে বৈকি।

তরীদের বাড়ী যাবার প্রাক্কালে শরীর খারপের বাহানায় এড়িয়ে যেতে সক্ষমও হয় নিলয়। মার চোখে কিছু একটা
ধরা পড়লে নিলয়ও নিখুঁত অভিনয়ে উৎরে যায়। মা মেনে নেন, প্রবাসে ছেলের  কর্মস্হলে হুট করে কিছু একটা
গড়বড় হওয়ায় জরুরী  ডাক এসেছে ফোনে যত দ্রুত সম্ভব ফিরতে হবে নিলয়কে। ছুটি ক্যান্সেল আপাতত।
মা তরীকে ফোনে ব্যাপারটা জানাতে উদ্যত হলে নিলয় মাকে বুঝায়,সে নিজেই বলবে। অযথা সারা বাড়িতে
এখনই জানাজানি হয়ে হুলুস্হুল বাধাটা কোন কাজের কথা না।

পরদিন ভোরে চেষ্টা তদবীরে কর্মস্হলের টিকিটের  সমাধানও হয়। উড়াল দেয় নিলয় ছক মত। আর মনের মধ্যে
ঘুরপাক খেতে লাগলো কিভাবে, কি কারন দর্শিয়ে, কেমন করে তরীর ছাড়পত্র তৈরি করবে সে।

তিন মাসের মাথায় ফোন এলো অচেনা নাম্বারে।
দেশ থেকে আগত অজানা নাম্বার দেখেই অনুমানও করলো নিলয়,নিশ্চয় তরী নামের নির্লজ্জ মেয়েটি। যে কিনা
বাসর রাতে প্রথম দেখাতেই করজোড়ে ক্ষমাপ্রার্থী হয়ে তার ক্ষমা না পাক করুণাটা আদায় করে নিয়েছে।
গোছানো জীবনটাকে করেছে বিক্ষত,  এলোমেলো। তার বাবার দ্বিতীয়  স্ট্রোক ঠেকাতে নিরুপায় হয়ে বিয়েতে মত
দিয়েছে। কিন্তু নিজ পছন্দের দীর্ঘ দিনের প্রেমকে জলাঞ্জলি দিতে না পেরে পরিকল্পিত চাল চেলেছে। যে চালে
আপাদমস্তক বলি হয়েছে নিলয়। নষ্ট করেছে নিলয়ের আপন জনের সুখ, ঘর ভরা মানুষগুলোর আনন্দকে।
ঠকিয়েছে সহজ সরল পরিবারটিকে।

মুহুর্মুহু বেজে চলেছে ফোনটি।  হাত বাড়িয়ে রিসিভারটি কানে লাগায় নিলয়। ওপার থেকে   ভেসে আসে রবিনের
চেনা কন্ঠ। কথা শেষে রিসিভার নামিয়ে নিস্তজ হাতটি রাখে পাশের সোফায়। জীবন নাটকের কোন ইচ্ছে ছিল না
বলে সারাজীবন নিলয় এড়িয়ে চলেছে  বিয়ের আগের প্রেম মোহ সব।। অথচ তরী  তার জীবনটা নিয়ে খেলা শুরু
করলো কেন প্রথমদিনই।

ছাড়তো সে দিতেই চেয়েছে, দিবেও। স্কুল বন্ধু এডভোকেট রবিনের সাথে ফোনালাপে এগুচ্ছে কাজ। রবিন
সহজভাবে নিয়েছে বিষয়টা। বলেছে এটা একদিয়ে ভালই হলো। শিকড় গভীরে যাওয়ার আগেই উপড়ে ফেলাটাই
বুদ্ধিমানের কাজ।
কাগজ পত্র সব রেডি, নিলয় গেলেই হাতে হাতে সম্পন্ন হবে। তরীর নাম্বারও দেয়া হয়েছে রবিনকে। প্রয়োজনে
যোগাযোগ করছে। আসলে
প্রয়োজনটাতো ওরই।
রিং টোন  বেজে ওঠতেই ভাবনার রেশেই স্ক্রীনে না তাকিয়ে ফোনটা কানে লাগায় নিলয়,  হ্যালো… রবিন আমি
এয়ারপোর্টে।  এখান থেকে বেরিয়ে সোজা তোর কাছে  ঝামেলাটা শেষ করে বাড়িতে ফিরবো।
—– হ্যালো আমি মানে রবিনের ফোন নয় এটা।
মেয়েলি কন্ঠে থমকে যায় নিলয় কয়টা মুহূর্ত। সামলে নিয়ে বলে,
—– সরি, আমি নাম্বার না দেখেই কথা বলা শুরু করেছিলাম। কাকে চাইছেন?
—— আপনাকেই চাইছি। মানে কথা ছিল।

নিলয় ভাল করেই জানে রবিন ছাড়া তার দেশে আসার কথা এখনও কেউ জানে না। নিশ্চয় রং নাম্বার।
ও প্রান্ত থেকে আবারও ভেসে আসে
—– আমার কিছু বলার ছিল…

একটু বিরক্ত হয়েই জবাব দেয় নিলয় এবার,
—– আশ্চর্যতো। আপনি কে, কাকে চাইছেন, নিশ্চিত না হয়ে..
—– আমি নিশ্চিত মিঃনিলয়ের সাথে কথা বলছি  যিনি এইমাত্র দেশের মাটিতে পা রাখলেন।'

নিলয় একবার ভাবে অযথা কথা না বাড়িয়ে ফোনটা রেখে দেয়া উচিত।
কিন্তু তা না করে বলে ওঠে,
—- আমিতো নিশ্চিত নই আমি রং নাম্বারে অচেনা কারো সাথে কথা বলছি কি না।
—- খুব চেনা না হলেও অচেনা নই। আমি তরী।  গেটে অপেক্ষা করছি। আসুন।
নিলয়ের কন্ঠ অস্ফুটে শুধু উচ্চারিত হলো, তরী!
কেটে গেল লাইনটা।
নির্বিঘ্নে গ্রীন চ্যানেল অতিক্রম করে নিলয় বেরিয়ে আসতেই তরীর মুখোমুখি হলো। খানিক আগের ফোনটা না
পেলে কস্মিনকালেও তরীকে চেনা নিলয়ের সম্ভব হতো না।
ছাই রঙা জমিনে গাঢ় মেরুন পাড়ের তাঁতের শাড়ী,   পিঠে দোলানো লম্বা বিনুনি আর ছোট্ট কপালের মাঝে আঁকা
মেরুন রঙা টিপ, চোখে আঁকা গাঢ় কাজল। ব্যস।
চোখ আটকে যাবার মত নিরাভরন রূপে অপরূপ তরী।
নিলয়ের মাথায় এই দুঃসময়েও দুষ্টুমি ভর করে, সুন্দরী মহিলাটি এখনও ওর বিবাহিতা স্ত্রী। এখান থেকে রবিনের
চেম্বারে ঢুকবার পরই সে হয়ে যাবে পরস্ত্রী। অর্থাৎ রাজু না কি যেন নাম তরীর প্রেমিকের। ছাড়পত্র  পেলেইতো
ওরা বিয়ে করবে। যার জন্য এত আয়োজন।

আঙুলে আঁচল পেঁচিয়ে চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছে তরী। দৃষ্টিও তুলছে না।
নিলয়ের অস্হির লাগে।কাজটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাড়ি যেতে পারছে না। দেশের মাটিতে পা রাখবার পর
মায়ের মুখ না দেখে সে কখনই কোথাও যায় নি। অথচ আজ মার অজান্তে অন্যের সিদ্ধান্ত  মানতে তার আগমন।
মাকে না জানিয়েই।
—- কথা আছে বলছিলেন। কিছু বলছেন নাতো?
আমি কাজটা তাড়াতাড়ি করতে চাই। তাই তাড়া আছে।
সরাসরি  তরী তাকায়,  নিলয়ের চোখে চোখ রেখে।
—-যদি বলি, সেদিনের কথাগুলো ফিরিয়ে নিতে চাই। আপনিতো বলেছিলেন, পুরনোর রেশ একেবারে  মুছতে
পারলে কোন আপত্তি নেই ঠাঁই দিতে। আমি পুরনোর রেশ ধুয়ে ফেলেছি।
নিলয় ভুপতিত হয় যেন।

আগামাথা কিছু না ভেবেই বলে ওঠে নিলয়, তা।হলে রাজু?
তৎক্ষনাত মাথা নিচু করে অতি ধীর লয়ে বলে চলে তরী,
ফিরার জায়গা যে ছিল না তা নয়। মনে পড়লো,সুন্দর
পৃথিবীতে আপনার মহানুভবতার কথা, লোভ জাগলো বাঁচতে। নাহলে ছাড়পত্রটা আমিই দিতাম আজ আপনাকে।
পৃথিবী থেকে  বিদায় নিয়ে।
নিলয় বিস্ময়ে নাকি ক্ষোভে বার দুই কব্জি উল্টে ঘড়ির  দিকে তাকালো আর ভাবলো রবিন কি সব রেডি করে
অপেক্ষা বসে আছে?  তাকে কি  এখনই একটা ফোন দেয়া প্রয়োজন?  জীবনটা কোন দিকে বাঁক নিতে যাচ্ছে?
আঁধারের অজানায় হারাবে নাতো বাঁক ঘুরতে গিয়ে?

পোষ্টটি 2845বার পঠিত

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন

Check Also

ভালোবাসা নিয়ে বিখ্যাত লেখকদের উক্তি

বাংলাবাজার২১ : ভালোবাসা নিয়ে বিভিন্ন সময় বিশ্বের সেরা লেখকরা বিভিন্ন রকম উক্তি দিয়েছেন। শেক্সপিয়ার থেকে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *