Home / সাহিত্য / গল্প / মণিষা রায়ের গল্প “মুক্তি”

মণিষা রায়ের গল্প “মুক্তি”

রথীন্দ্রনাথ রায় অত হিসেব কষে নয়, তবে বলতে পারি বয়স তার প্রায় ৮৫ বছর। শরীর এখন আর চলতে চায় না। টলতে টলতে আবার ঠিকঠাক কেমন যেন দাঁড়িয়ে পড়ে। এখন বেঁচে থাকাটাই বিরক্তিকর মনে হয়। সত্যি, সময়ের অতিরিক্ত বেঁচে একটা অভিশাপ বোধদয়। স্ত্রীর নাম মায়া। আজকাল ওকে স্ত্রী বলবে না, জড়পদার্থ বলবে সেটাই মনে হয়। অবশ্য তার স্বরে যখন চিৎকার করে, তখন জড়পদার্থ না বলাই ভালো। গত কয়েক বছর ধরে উনি স্বামীকে সেচ্ছায় মুক্তি দিয়েছেন। সংসার থেকে স্বামী চেয়ে বছর ১৫ ছোট, প্রায় ৫৫ বছরের  তাদের কোনকালেই যে খুব বেশি ভাব ভালোবাসা নিয়ে দাম্পত্য জীবনে সুখি ছিলো না। মানুষ বলে নারীরা নির্যাতিত হয়, কিন্তু স্বামী বলে চোখের আড়ালে কত যে পুরুষ গৃহ নির্যাতনের স্বীকার হয় তা কেউ জানে না। বরাবরই সে যথেষ্ট স্বৈরাচারী, বদমেজাজি। তাদের যখন বিয়ে হয়, তখন তো আর বর-কনের মতামতের কোন জিজ্ঞাসাবাদ ছিলো না। তাই দাদা মশাই আর তার দাদা মশাই দু’বুড়োর যোগ সাজশে ঋষি প্রজাপতির আর্শীবাদে তাদের বৈবাহিক কর্ম সম্পাদন হয়। বুড়ো যদি আজ বেঁচে থাকতেন তবে জিজ্ঞাসা করতেন কোথা থেকে তিনি তার জন্য এমন অবতার যোগার করেছিলেন। সংসার জগতে কারো সাথে তার খুব একটা বনিবনা হত না। তার পৈতৃক ভিটা থেকে যারা এই বাড়িতে মাঝে মাঝে আসতেন তারা ওনার কটু ভাষা থেকে খুবই কম বঞ্চিত হতেন। এই জন্য না পারতে তার বাড়িতেও কেউ খুব এটা ঘেঁষতে চাই তো না। হ্যাঁ কিছু কিছু জায়গায় হয় তো সে জনপ্রিয় ছিলো, যারা তার কথা খুব মনযোগ দিয়ে শুনতো, তার কথাই বেদবাক্য বলে মানতো। এতো কথা বলছি মানে এই নয় যে স্ত্রীর নিন্দা করতে বসেছি। তার একগুঁয়ে মনোভাব সত্যি জীবনকে অতিষ্ট করে তুলেছে। আজ থেকে ৩০ বছর আগে তার বড়দার মেয়ে রাধু নিজে পছন্দ করে বাড়ি ছেড়ে বিয়ে করেছিলো। শেষ পর্যন্ত সবাই মেনে নিলো, কিন্তু তিনি নিলেন না। এখন পর্যন্ত সেই ভাইজি বাড়িতে পা  রাখতে পারেনি। তিনি বা কি পুরুষ আর এই জেদতে সম্মান করতে গিয়ে তার দাদার শেষ ইচ্ছেটার মর্যাদা দিতে পারেনি। তার দাদা চেয়েছিলেন তার জীবদ্দশায় মেয়েটাকে এক বেলা তার বাড়িতে আনতে পারতেন, কিন্তু তা হয়নি। তার জীবদ্দশায় আর মনে হয় সম্ভব নয়। কিন্তু আজকাল আর পারেনি। এখন স্বামী বয়সের ভাড়ে ক্লান্ত-শ্রান্ত শ্বাষ কষ্টটায় আরো কাহিল করে ফেলেছে। আজকাল তার হুকুমের চাকর হয়ে গেছে বলে মনে হয়। তার দাবি বাম হাতে ব্যথা থাকার কারণে ওনি এখন দায়িত্ব থেকে অভ্যহতি নিয়েছেন। স্ত্রী সকালে ঘুম থেকে  উঠে নমঃ নমঃ করে পূজোর কাজ শেষে তিনি শুয়ে পড়েন। তার ছেলের বউ স্নানের গরম জল, চা বানিয়ে, দুধ গরম করে, সংসারের রান্না সেরে ইতোমধ্যে স্কুলে চলে যায়। তার নাতি দিব্য স্কুলে চলে যায়, আর ছেলে দোলন যথারীতি তাদের কাজে অফিসে চলে যায়। এরপর শুরু হয় স্বামীর খাবার মতো ফ্লাসে কাঁপা কাঁপা হাতে জল ভরে। সন্ধায় আহ্নিক সেরে আবার চা গরম করে তাকে দিয়ে খেতে হয়। স্ত্রী তখনো শুয়ে পড়ে, আবার স্বামী যায় পেয়ালা পিরিচ ধুয়ে রান্না ঘর থেকে গরম দুধ করে আনে এবং রুটি দিয়ে স্ত্রীকে খেতে দিতে হয়। তারপর স্বামী নিজে খেয়ে নেন। স্ত্রী খেয়েদেয়ে এবারো শুয়ে পড়েন। এতো শুতে পারে কি করে। এই কাজগুলো করার পর মাঝে মধ্যে এতো ক্লান্তি হয় যে, বেঁচে থাকাটাই কাল। আবার দুপুরের খাবার খাওয়া সবই চলে মেশিনের মতো। স্ত্রী খেয়ে আবার শুয়ে পড়েন। সবই যে যেমন তেমন। সবচেয়ে গোল বাঁধে ছেলে দোলন আর তার মায়ের মধ্যে। ছেলের বউ স্কুলে চাকুরী করে, টিউশনি করে। সংসারের কাজ কর্ম সবই সারে। কিন্তু মাঝে মাঝে যে ক্ষেপে যায়, ক্ষ্যাপারই কথা। সব চেয়ে রেগে যায় দোলন। মায়ের অহেতুক শুয়ে থাকা আসলে কোন সন্তান মানতে পারে না। বাম হাতে ব্যথার জন্য তাকে ডাক্তার দেখানো হলো। ডাক্তার তাকে ব্যায়াম বললেন, কিন্তু কিছুই সে করবে না, সারাদিন শুয়ে থাকা ছাড়া। দোলন যখন দেখে ঘর ঝাড়ু দিচ্ছি, বাসন ধুচ্ছি সে তার মায়ের ক্ষেপে গিয়ে অবিবেচকের মতো আচরণ করতে থাকে, তখন বড্ড বিব্রত বোধ করি। সন্তানের সাথে কোন মায়ের এতো বৈরী আচরণ এটা সাভাবিক নয়, এ বড্ড জটিলতা। মা-ছেলের দন্দে রথীন্দ্র বাবু বিভ্রান্ত। মায়ার কাণ্ডকারবারে নিজেও লজ্জাবোধ করেন। কখনো কখনো এমন সব ভাষায় স্বামীকে গালাগালি করে যে তখন দু’হাত দিয়ে কান ঢেকে রাখতে ইচ্ছে হয়। বাড়ির পরিবেশ খামোখা অশান্তিতে ভরে যায়। মনে হয় চারদিক টুকরো টুকরো করে নিজেই একা বের হয়ে যাই, কিন্তু পারি না। রথীন্দ্র যে ন্যুজ্জ, শ্রান্ত, ক্লান্ত অতি ভদ্রলোক। তাই এই অবস্থা থেকে মুক্তি চায়। আজ রথীন্দ্র বাবুর মুক্তি ঘটেছে। সবার সামনে বলতে পারি না। কিন্তু মায়া রাণী ইহধাম ত্যাগ করে পরলোকে গিয়েছে।

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন

Check Also

নজরুলের পুত্রবধূ উমা কাজী আর নেই

বাংলাবাজার২১ : জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বড় ছেলে কাজী সব্যসাচীর স্ত্রী উমা কাজী মারা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *