বৃহস্পতিবার , ফেব্রুয়ারি ২০ ২০২০
Home / সাহিত্য / প্রবন্ধ / ফররুখের ছড়া ও কিশোর সাহিত্য

ফররুখের ছড়া ও কিশোর সাহিত্য

আবু আফজাল সালেহ : ‘ঝুমকো জবা বনের দুল/উঠল ফুটে বনের ফুল।/সবুজ পাতা ঘোমটা খোলে,/ঝুমকো জবা হাওয়ায় দোলে। সেই দুলুনির তালে তালে,/মন উড়ে যায় ডালে ডালে।’- (ঝুমকো জবা)

অথবা ‘বৃষ্টি এল কাশ বনে/জাগল সাড়া ঘাস বনে,/বকের সারি কোথা রে/লুকিয়ে গেল বাঁশ বনে।/নদীতে নাই খেয়া যে,/ডাকল দূরে দেয়া যে,/কোন সে বনের আড়ালে/ফুটল আবার কেয়া যে।/গাঁয়ের নামটি হাটখোলা,/বৃষ্টি বাদল দেয় দোলা,/রাখাল ছেলে মেঘ দেখে,/যায় দাঁড়িয়ে পথ-ভোলা।/মেঘের আঁধার মন টানে,/যায় সে ছুটে কোনখানে,/আউশ ধানের মাঠ ছেড়ে/আমন ধানের দেশ পানে।’ (বৃষ্টির ছড়া)।

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ একজন কবির লেখা। তাঁর নাম ফররুখ আহমদ। কবি ১৯১৮ সালের ১০ জুন মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার মাঝাইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি শিশু-কিশোর কবিতা রচনা করেছেন। তাঁর রচিত অন্যান্য কাব্য-কবিতার তুলনায় শিশু-কিশোর ছড়া-কবিতার ওপর খুব কম আলোচনা হয়েছে। তাঁর রচিত শিশু-কিশোর কাব্যের সংখ্যা মোট ২১টি। প্রকাশিত শিশুতোষ গ্রন্থের সংখ্যা ৭টি। কবির বেঁচে থাকাকালীন প্রকাশ হয়েছে ৪টি ছড়ার গ্রন্থ। অন্যান্যগুলো অপ্রকাশিতই রয়ে গেছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য শিশুতোষ গ্রন্থ-পাখির বাসা (১৯৬৫), হরফের ছড়া (১৯৭০), চাঁদের আসর (১৯৭০), ছড়ার আসর (১৯৭০), ফুলের জলসা (ডিসেম্বর, ১৯৮৫)।

কবির প্রথম শিশুতোষ বই পাখির বাসা। এখানে সাতটি অনুচ্ছেদে ভাগ করে মোট পঁয়ত্রিশটি ছড়া-কবিতা আছে। ভাগগুলো হচ্ছে- পাখির বাসা, মজার ব্যাপার, পাখ-পাখালি, পাঁচ মিশালী, রূপ-কাহিনী, সিতারা ও চলার গান। পাখির বাসা শিরোনাম অধ্যায়ে আছে পাখির বাসা, ঘুঘুর বাসা, বকের বাসা, প্যাঁচার বাসা, গাঙ শালিকের বাসা, বাবুই পাখির বাসা, চড়ুই পাখির বাসা ইত্যাদি ছড়া-কবিতা।

‘মজার ব্যাপার’ অনুচ্ছেদে আছে- মজার ব্যাপার, মজার কোরাস, মেলায় যাওয়ার ফ্যাঁকড়া, নরম গরম আলাপ, দূরের কীর্তি, দাদুর কিসসা ছড়া-কবিতা। ফররুখ আহমদ শিশুদের ঝিমিয়ে পড়া মনকে জাগিয়ে তোলার জন্য জিজ্ঞাস করছেন কোথায় তিনি মজা পাবেন। ‘মজার ব্যাপার’ কবিতার শুরুতেই বলছেন- ‘মজার ব্যাপার! মজার ব্যাপার!/কোথায় পাব মজার ব্যাপার?/চলছে-সব-ই সোজাসুজি/তাইতো মিছে খোঁজাখুঁজি/ভেবে ভেবে হদ্দ সবাই,/মজার ব্যাপার পাই কোথায় ভাই?’ ‘মেলায় যাওয়ার ফ্যাঁকরা’ ছড়ায় লিখলেন মেলার পরিবেশ। শিশুদের অবস্থা- ‘বাপ্রে সে কী ধুম ধাড়াক্কা/দিচ্ছে ধাক্কা, খাচ্ছে ধাক্কা, গুঁতোর চোটে হয় প্রাণান্ত/হাঁপিয়ে ওঠে ক্যাবলা কা-!/লাগলো যখন বিষম তেষ্টা/ক্যাবলা করে ডাবের চেষ্টা।/তাকিয়ে দেখে পকেট সাফ,/ভিড়ের ভিতর দেয় সে লাফ।’

এমনভাবে পাখ-পাখালি’তে- পাখ-পাখালি, টুনটুনি, কাঠ-ঠোকড়া কুটুম পাখি, টিয়ে পাখি, ফিঙে পাখি, মাছ রাঙা, শীতের পাখি, পাঁচ-মিশালী’তে ঝড়ের গান, বৃষ্টির গান, বর্ষা শেষের গান, শরতের

গান, শীতের গান, ফালগুনের গান, চৈত্রের গান ইত্যাদি নামীয় ছড়া আছে। অন্য তিনটি অংশেও মজার মজার ছড়া কবিতা আছে।

‘হরফের ছড়া’ ফররুখ আহমদের একটি দারুণ শিশুতোষ বই। প্রায় প্রতিটি বর্ণের বিভিন্ন উপমার মাধ্যমে ব্যখ্যা করেছেন, ছন্দে ছন্দে। এগুলো এতোই সুন্দর ও আকর্ষণীয় যে, শিশুরা এসব ছড়া পড়ে সহজেই বাংলা বর্ণমালা শিখতে পারে। যেমন : ‘অ’ এবং ‘আ’ দিয়েই শুরু করি-

‘অ য়ে অতসী-তিসির মাঠ,

অশথ গাছের সামনে হাট,

অলিগলি শহর চাই,

অলিগলি শহর পাই’

‘আ য়ে আনারস, আম বাগান,

আসমানী রঙ ফুলটা আন,

আসমানী রঙ মন টানে;

আ যেতে চায় আসমানে ‘

‘ক’ আর ‘খ’ অক্ষর দিয়ে কবি শিশুমনে ঢুকে গেলেন। হারিয়ে গেলেন বন-বাদাড়ে। পাখি আর কলমিতে। যা গ্রামবাংলার শিশুমনের চমৎকার উপাদান। তুলে ধরলেন শিশুদের কাছে-

‘ক-য়ের কাছে কলমিলতা

কলমিলতা কয়না কথা

কোকিল ফিঙে দূর থেকে

কলমি ফুলের রঙ দেখে।’

‘খ কে নিয়ে খেঁক শিয়ালী

যায় পালিয়ে কুমারখালী

পাখ-পাখালি খবর পেয়ে

খরগোসকে দেয় জানিয়ে।’

ঘোড়া শিশুদের প্রিয় জিনিস। আর ব্যাঙ! কল্পনাতেও দেখে শিশুরা ঘোড়া। দাদি-নানির কাছে রূপকথাতেও শিশুরা শোনে ঘোড়ার নাম। রাজকুমার চড়ে এতে। আর ব্যাঙের ডাক মাতাল করে শিশুদের। ‘ঘ’ আর ‘ঙ’ নিয়ে লিখলেন কবি দারুণ ছড়া-

‘ঘ য়ে ঘোড়া এল যেই

খোঁড়া হ’ল সকলেই,

কালো ধলো দুই ঘোড়া

দু’য়ে মিলে এক জোড়া।’

‘ঙ জানে রঙ ঢঙ,

রঙ নিয়ে খেলা সঙ,

লিকলিকে সরু-ঠ্যাং

লাফ দেয় কোলা ব্যাঙ।’

‘ঝ’ বর্ণ দিয়ে লিখনেন, উপমা প্রয়োগ করলেন। একই সাথে শিশুর হাসির ব্যবস্থাও করলেন। ট বর্ণ দিয়েও একই কাজ করলেন কবি। একেবারেই শিশুমনে ঢুকে গেলেন। টিয়া, টাট্টু ঘোড়া শিশুদের পছন্দের বিষয়।

‘ঝ য়ের পাশে ঝিঙে,

ঝিঙে লতায় ফিঙে

ঝিঙে লতা জড়িয়ে গেলো

কালো গরুর শিঙে’

‘ট য়ের পাশে টাট্টু,

খেলছে ওরা লাট্টু,

টয়ের কাছে টিয়ার ঝাঁক

অবাক হ’য়ে দেখছে কাক’

বাজার বা পাশের ঘাটের কথা প্রকাশ করলেন ‘ছ’ আর জ অক্ষর দিয়ে। যেখানে শিশুরা খুব কৌতূহলী থাকে-

‘ছ য়ে ছড়ার শহরে

সুর উঠেছে নহরে,

রং তামাশা হাজারে

ছড়া ছবির বাজারে’

‘(বর্গীয়) জ য়ে জামদানি

জাহাজ ঘাটে আমদানি;

দূর পাহাড়ে ফুল ফুটেছে

রঙটা নাকি জাফরানি।’

রাজধানী ঢাকা ও পাশে কীভাবে নদী বেয়ে চলে তাও বর্ণ দিয়ে তুলে ধরলেন কবি। ব্যবহার করলেন ‘ঢ’ বর্ণ।

‘ঢ য়ের পাশে ঢাকা

কথাটা নয় ফাঁকা

ঢাকা শহর পাশে রেখে

বইছে নদী বাঁকা।’

এরকম প্রায় সব বর্ণ দিয়েই কবি লিখলেন। বিভিন্ন উপমা ব্যবহার করলেন। যেগুলো আশপাশেই থাকে। কোনোটা আবার শিশুমনের কল্পনাতেই থাকে।

পউষের কথা কবিতায় চমৎকারভাবে উপস্থাপন করলেন পৌষের চারিদিকের অবস্থা আর অনুভূতির কথা। ‘উত্তরী বায় এলোমেলো/পউষ এল! পউষ এল!/হিমেল হাওয়ায় শিরশিরিয়ে/এল অচিন সড়ক দিয়ে,/মাঠ, ঘাট, বন ঝিমিয়ে গেলো;/পউষ এল! পউষ এল!/মাঠের ফসল আসলো ঘরে,/ধান দেখে ভাই পরাণ ভরে/কিষাণ-চাষীর মন ভরে যায়/গল্পে গানে; মিঠাই, পিঠায়,/গুড় পাটালির সোয়াদ পেলো;/পউষ এল! পউষ এল!’

কবির অপ্রকাশিত গ্রন্থের বেশ কিছু মজার মজার ছড়া তুলে ধরছি। যা শিশুমনে আনন্দের খোরাক দেবে নিশ্চয়।

(১) ‘আয়রে ঘোড়া পরেনদা/পাখনা মেলে উড়ে যা,/কিসসা শুনি রোজ আমি/করি যে তোর খোঁজ আমি,/জোসনা যখন ফুটফুটে/মনে মনে যাই ছুটে,/সাঁঝের পরী রয় পিছে;/মাটির ধরা রয় নিচে।’

(২) ‘চেরাগটাতে জ্বালো/আঘণ মাসের আলো;/নীহার-ভেজা মাঠে নামে/রাতের ছায়া কাল,/মাগো তোমার কিসসা কথা/লাগবে এখন ভালো।’

(৩) ‘বাদা বনে বসত করে/বাইরে এসে শিকার ধরে,/হলদে কোটে কাল ডোরা/বাঘ দেখে যা আজকে তোরা।’

(৪) ‘বনের রাজা সিংহ ভাই,/ভয় ভাবনা কিছুই নাই,/চওড়া যে তার বুকের ছাতি/ডরায় না সে দেখলে হাতি।’

(৫) ‘ভয়ে পালায় বোকা,/ভয় পায় না খোকা!/খোকন সোনার সাহস ছিল,/বুদ্ধি ছিল চোখা;/ভয় না পেয়ে ভেঙে দিল/হুতোম পেঁচার ধোঁকা।’

(৫) ‘আলফা ডাঙায় যাবি কে?/আমটা পেড়ে খাবি কে?/আলফা ডাঙার মাঠে/ধুতুম, ধুতুম ডাকে;/ আলফা ডাঙায় যাব না/আমটা আমি খাব না।’

কবি ফররুখ আহমদ অনুপম সাহিত্যচর্চার জন্য বিভিন্ন পুরস্কার/পদক পান। ১৯৬৬ সালে শিশুতোষ বই ‘পাখির বাসা’ লিখে ইউনেস্কো পুরস্কার এবং একই বছর ‘হাতিম তায়ী’ বইয়ের জন্য পান আদমজী পুরস্কার। তার আগে ১৯৬০ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ১৯৬৫ সালে প্রেসিডেন্ট পদক ‘প্রাইড অব পারফরমেন্স’ পুরস্কার পান। ১৯৭৭ ও ১৯৮০ সালে তাঁকে যথাক্রমে মরণোত্তর একুশে পদক ও স্বাধীনতা পদক দিয়ে সম্মানিত করা হয়। ১৯৭৪ সালের ১৯ অক্টোবর ঢাকায় মহান কবি মারা যান।

সূত্র : দৈনিক জনতা

পোষ্টটি 127বার পঠিত

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন

Check Also

রুদ্র অয়নের গল্প “কালো ছেলে”

টিউশনি করানোর চতুর্থ দিনের মাথায় ছাত্রীর মা অনিককে ডেকে হাতে কিছু টাকা দিয়ে বলল, ‘কাল …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *