বৃহস্পতিবার , ফেব্রুয়ারি ২৭ ২০২০
Home / সাহিত্য / প্রবন্ধ / জনপ্রিয় হুমায়ূন

জনপ্রিয় হুমায়ূন

হাসনাত আবদুল হাই : লেখক হিসেবে হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয়তা প্রবাদপ্রতিম। জীবদ্দশায় তিনি যত জনপ্রিয় ছিলেন, মৃত্যুর পরও সেই জনপ্রিয়তায় একটুও চিড় ধরেনি। মৃত্যুর পরও তার বইয়ের কাটতি এবং যথেষ্ট প্রাণবন্তভাবে যে তার জন্মদিন পালন করা হচ্ছে- তা এ কথাই প্রমাণ করে। জীবিতকালে তিনি হয়ে উঠেছিলেন একজন কাল্ট ফিগার; ভক্তি ও শ্রদ্ধার ব্যক্তি। মৃত্যুর পর তার সেই কাল্ট পরিচিতি যেন আরও দৃঢ় হয়েছে। যারা বলেছিলেন, তার জনপ্রিয়তা জলের বুদবুদের মতো ক্ষণস্থায়ী; তা জীবনেরই কেবল, মৃত্যুর পর কখনই নয়- তাদের এই ভবিষ্যৎ বাণী মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।

বাংলা সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদের মতো জনপ্রিয়তা আর কেউ পাননি- এ কথা এখন অবিসংবাদিত। রবীন্দ্রনাথ সব শ্রেণির পাঠকের কাছে আদৃত ছিলেন না; শরৎচন্দ্রের জনপ্রিয়তাও সীমাবদ্ধ ছিল মাঝবয়সের নর-নারীদের কাছে। হুমায়ূন আহমেদ পৌঁছুতে পেরেছিলেন সকল শিক্ষিত বাঙালি পাঠকের কাছে। বাংলাদেশে তার পাঠকপ্রিয়তা শুরু হলেও একসময় পশ্চিমবঙ্গেও তার পাঠক তৈরি হয়েছে। সাপ্তাহিক দেশ পত্রিকা তাদের শারদীয়া বিশেষ সংখ্যায় হুমায়ূনের উপন্যাস ছেপে সেই স্বীকৃতি দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের লেখকরা বাংলাদেশের লেখকদের অধিকাংশের নাম না জানলেও হুমায়ুন আহমেদের নাম জানেন। তাদের মধ্যে যারা ঢাকায় এসেছেন, অধিকাংশই প্রথমে হুমায়ূনের খোঁজ করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, হুমায়ূন অপ্রাপ্তবয়স্ক, যাদের টিন এজার বলা হয় তাদের কাছেই জনপ্রিয়। কিন্তু দেখা গেল স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রী তো আছেই; তার পাঠকের মধ্যে রয়েছেন তাদের বাবা-মাও। হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয়তা প্রাপ্তবয়স্কদেরও নানাভাবে টেনে নিয়েছে। এর অর্থ হলো এই যে, তিনি কেবল কিশোর-কিশোরী বা তরুণ বয়সের পাঠককে তার সম্মোহনী গুণে আকর্ষণ করেননি; মুগ্ধ করেছেন প্রাপ্তবয়স্কদেরও। সব প্রাপ্তবয়স্ক হয়তো নয়, কিন্তু তাদের অনেকেই হুমায়ুন আহমেদের বই কোনো না কোনো সময়ে পড়েছেন। কেন পড়েছেন? যে কারণে ছেলে-মেয়েরা পড়েছে; পড়তে ভালো লাগে। কখন একটা বই পড়তে ভালো লাগে? যখন সেই বই তরতর করে পড়ে যাওয়া যায়, কোনো জটিল বাক্য বা বিশ্নেষণের জালে আটকে যেতে হয় না। বর্ণনায় এবং ভাষায় এই সহজ সরলতা- এটাই ছিল হুমায়ূন আহমেদের সিক্রেট। তিনি তার পাঠকদের তত্ত্বকথা শোনাতে চাননি; জীবনের নিগূঢ় ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেননি, কেবলই গল্প বলে গিয়েছেন; কোনো ভণিতা না করে, পাণ্ডিত্য না দেখিয়ে। এতে কি সাহিত্যের ক্ষতি হয়েছে? মোটেও না। এই যে লক্ষ লক্ষ পাঠক সৃষ্টি; অপ্রাপ্ত, প্রাপ্তবয়স্কদের বই পড়া, বই পড়ার দিকে টেনে আনা- এতে কি সাহিত্যের ক্ষতি হয়েছে? বইবিমুখ হয়ে যেতে পারত যারা, তাদের হাতে বই তুলে দিয়ে তিনি কি সাহিত্যের উপকারই করেননি! অবশ্যই করেছেন। তিনি পাঠক সৃষ্টি করেছেন, যা না হলে সাহিত্য টিকে থাকতে পারে না।

কেউ কেউ বলেছেন, হুমায়ূন পাঠক সৃষ্টি করেছেন ঠিকই, কিন্তু তারা কেবল সহজিয়া ধারার লেখাই পড়েছে এবং সেই শ্রেণির লেখা গুরুত্ব দিয়ে পড়তে গিয়ে সিরিয়াস ধারার লেখা পড়ার ক্ষেত্রে একটা প্রাচীর তুলে দিয়েছে। যারা এ কথা বলেন, তারা ভুলে যান যে, পড়া একটা যাত্রা। এই যাত্রা যেখান থেকেই শুরু করা হোক না কেন, সেখানেই থেমে থাকে না। পড়ার অভ্যাস হয়ে গেলে একজন পাঠককে সব ধরনের লেখাই পড়তে হয় এক সময়। সহজ থেকে কঠিন ধরনের বই পড়তে তখন দ্বিধাগ্রস্ত হতে হয় না। পড়ার নেশা জটিল বিষয়ে লেখা কিংবা কিছুটা জটিল করে লেখা বই পড়তেও সাহায্য করে। যারা তাদের পাঠক জীবন শুরু করেছিল হুমায়ূনের বই পড়ে, তারা আমৃত্যু কেবল তার বই-ই পড়ে গেছে- এমন দৃষ্টান্ত কেউ দিতে পারবে না।

সহজিয়া লেখনশৈলীর আরও একটা দিক আছে, যা ভুলে গেলে চলবে না। অনেক কঠিন বিষয় সহজ করে বলা হলে, সেসব সাধারণ পাঠকেরও বোধগম্য হয়। এটা কি একটা ত্রুটি? মোটেও না। হুমায়ূন আহমেদ বেশ কঠিন বিষয়কে সহজ করে বুঝিয়েছেন তার কোনো কোনো লেখায়। যেমন তার ‘জোছনা ও জননীর গল্প’। তাছাড়া তার সব নাটকেই জটিল জীবনের উন্মোচন রূপকথার মতো সহজ-সরল নয় মোটেও। কিন্তু জটিল কাহিনীকে হুমায়ূন সরল করে বর্ণনা করেছেন। যা আপাতদৃষ্টে সহজ-সরল তার পেছেনে রয়েছে জটিল ঘটনার বিন্যাস। সুতরাং হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয়তার পেছেনে যে সরল বর্ণনা- তার কারণ হিসেবে দেখা যায় জটিল ঘটনার বিন্যাস ও তাকে সরলীকরণের প্রক্রিয়া। এটা ভুলে গেলে তার লেখার আসল চরিত্র জানা যাবে না। হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয়তার ক্ষেত্রে আরও একটা বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। তিনি অশ্নীলতা বা যৌন সুড়সুড়ি দিয়ে জনপ্রিয়তা বাড়াবার জন্য লেখেননি। তার কোনো লেখাতেই শ্নীলতার সীমানা অতিক্রম হতে দেখা যায়নি। তিনি অত্যন্ত রুচিসম্মত লেখক ছিলেন। যদি সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জন করাই তার উদ্দেশ্য হতো, তাহলে তিনি পাঠকের সেই নিম্ন পর্যায়ের রুচিকে প্রশ্রয় দিয়েই লিখতেন।

সহজভাবে সরল করে যেসব গল্প বা উপন্যাসের কাহিনি হুমায়ূন আহমেদ বলেছেন, সেসব বাস্তব জীবন থেকেই নেয়া। হয়তো কোথাও অতিরঞ্জন আছে বা একটু সরলীকরণ রয়েছে, কিন্তু তার ভিত্তি বাস্তব জীবনেই। কল্পকাহিনি নিয়ে গল্প বা উপন্যাস লেখেননি হুমায়ূন আহমেদ। তার সব চরিত্রই রক্ত-মাংসের। রোবটের মতো ধাতু ও যন্ত্র দিয়ে তৈরি নয়। যেহেতু রক্ত-মাংসেরই চরিত্র, সে জন্য তারা কোনো না কোনোভাবে জগৎ সংসারের সাথে সম্পৃক্ত। হিমু কিংবা মিসির আলি টাইপ চরিত্র হতে পারে কিন্তু তারা সমাজ জীবনেরই সৃষ্টি। হুমায়ূনের পাগল, খামখেয়ালি এবং কৌতুকপ্রবণ সব চরিত্রই বাস্তব। কেননা, বাস্তব জীবনেও তাদের দেখা পাওয়া যায়। সব সময় সবার মধ্যে না হলেও কখনও কখনও কোনো মানুষের মধ্যে তাদের দেখা যায়। টাইপ চরিত্র নিয়ে কাজ করেছেন বলেই হুমায়ূন বাস্তবতাবর্জিত কাহিনি লিখেছেন- এ কথা বলা যায় না। তার চরিত্রগুলোও বাস্তবেরই প্রতিফলন। হয়তো বিশেষ ধরনের; সাধারণের মতো নয়। কিন্তু তারা বাস্তব জীবন থেকেই এসেছে; কল্পজগৎ থেকে নয়। টাইপ চরিত্র বলেই হিমু কিংবা মিসির আলিকে তুচ্ছ বা হেয় বলে মনে হয় না। আরও এক কারণে তাদের নিরিখেই তাদের প্রতিতুলনাতেই সাধারণ চরিত্রের মানুষদের বিচার করা সম্ভব হয়। এই অর্থে টাইপ চরিত্র হয়ে যায় সাধারণ মানুষের দর্পণ, যা দেখে তাদের আচার-আচরণ বোঝা যায়।

টাইপ চরিত্র নিয়ে হুমায়ূন যে গল্প বলেছেন, সে সব কিন্তু টাইপ গল্প নয়। সাধারণ ঘটনার সমন্বয়ে গড়ে ওঠে দৈনন্দিনের যে জীবন; হুমায়ূন সংসারের সেই দৈনন্দিনতায় স্থাপিত করেছেন তার টাইপ চরিত্রদের। গুপী গাইন ও বাঘা বাইনের মতো টাইপ চরিত্র যেভাবে রূপকথার রাজ্যে প্রবেশ করেছে, হুমায়ূনের হিমু কিংবা মিসির আলি তেমনভাবে কল্পিত, সাজানো জীবনে বাস করে না; সাময়িকভাবেও না। সুতরাং হুমায়ূন অবাস্তব গল্প-উপন্যাস লিখেছেন- এ কথাও বলার উপায় নেই।

হুমায়ূনের জনপ্রিয়তা যে ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তার মৃত্যুর পরও তা স্তিমিত হয়ে যায়নি, এটা একটা কারণেই- তিনি বিশ্বাসযোগ্য সব মানুষের কথাই বলেছেন। এর জন্য ব্যবহার করেছেন সহজ-সরল ভাষা আর লেখনশৈলী।

সূত্র : সমকাল

পোষ্টটি 67বার পঠিত

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন

Check Also

ভালোবাসা নিয়ে বিখ্যাত লেখকদের উক্তি

বাংলাবাজার২১ : ভালোবাসা নিয়ে বিভিন্ন সময় বিশ্বের সেরা লেখকরা বিভিন্ন রকম উক্তি দিয়েছেন। শেক্সপিয়ার থেকে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *