বৃহস্পতিবার , ফেব্রুয়ারি ২৭ ২০২০
Home / ফটোগ্যালারী / বইয়ের অনিল, পর্দার অনিল

বইয়ের অনিল, পর্দার অনিল

অলোক আচার্য : বিখ্যাত সব বই থেকে বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাণ অতীতেও হয়েছে এখনও হচ্ছে। এটা যেমন বাংলাদেশে তেমনি বাইরেও রয়েছে। সেসব বইয়ের মত চলচ্চিত্রও দর্শকের মাঝে সাড়া ফেলে দেয়। এটা সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয় সেই সব দর্শকদের যারা সেই বইটি পড়েছে তাদের। আমার কাছে তাই মনে হয়। পাঠকরা সে সময় দর্শক হয়ে চেষ্টা করেন যে বই থেকে পর্দায় কাহিনীটি এসেছে সেটি কতটুকু সামঞ্জস্য হয়েছে। বইয়ের চরিত্রগুলো পর্দায় ঠিকমতো এসেছে কি না। এসব প্রশ্ন মাথার ভেতর ঘুরপাক খায়। সে কারণে সাধারণ দর্শকদের থেকে এসব বই পড়া দর্শকদের আগ্রহ এবং বিশ্লেষণে একটা পার্থক্য থাকে। বাংলা সাহিত্যে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে বহু উপন্যাস এবং তা থেকে চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে। উদাহরণ অনেক রয়েছে। প্রতিনিয়তই নতুন নতুন সাহিত্য সৃষ্টি হচ্ছে। সাহিত্যের একেকটি শাখা নতুন করে মুক্তিযুদ্ধ ও তৎকালীন পরিস্থিতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরছে। কবিতা,ছড়া,ছোটগল্প,উপন্যাস ও প্রবন্ধের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধকে পাঠকদের কাছে উপস্থাপন করছেন লেখকরা। ভবিষ্যতেও আরও অনেক সাহিত্যকর্ম রচিত হবে মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে। প্রয়াত পাঠকপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক অনেক সাহিত্য রচনা করেছেন। লিখেছেন কালজয়ী সব উপন্যাস। প্রতিটি উপন্যাসই সাহিত্যের বিবেচনায় এক অমূল্য সম্পদ। এসব উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধকালীন পরিস্থিতি সূচারুরুপে বর্ণনা করেছেন। এরকম বহু উদাহরণ না টেনে প্রয়াত কথাসাহিত্যিকে হুমায়ুন আহমেদের ’অনিল বাগচীর একদিন’ উপন্যাসটির কথাই ধরা যাক। ’অনিল বাগচীর একদিন’ উপন্যাসটি পাঠক মহলে ব্যাপক জনপ্রিয়। উপন্যাসের চরিত্র, বর্ণনা,আবেগ সবকিছুই একেবারে নিখুঁত। উপন্যাসটি আমি কম করে হলেও পাঁচ বার পড়েছি। প্রত্যেক বারই আগ্রহ ছিল সমান। এরপর যখন এই উপন্যাসটি বই থেকে সিনেমায় রুপান্তরিত হলো তখন আমি বারবার আমার পড়ার সাথে উপন্যাসের কেন্দ্রিয় চরিত্র অনিলের চেহারা, আচরণ,পোশাক,কথা বলার ধরণ,উপন্যাসের কাহিনী এবং প্রতিটি চরিত্রের খুঁটিনাটি দিক খুব মনোযোগের সাথে লক্ষ্য করলাম। সত্যি কথা বলতে আমি উপন্যাসটি পড়ার সময় চোখ বুজে যে অনিলকে কল্পনা করেছিলাম পর্দার অনিলটি ছিল অনেকটা সেরকমই। সাধারণ, সহজ সরল এবং কিছুটা ভীত চরিত্রের। উপন্যাসের মূল চরিত্র অনিল নামের এক হিন্দু যুবক। ঢাকায় চাকরি করে। যুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার পরেও সে ঢাকায় অবস্থান করে। তার বাবার মিলিটারীর হাতে মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে সে গ্রামের বাড়ির দিকে রওনা দেয়। উপন্যাসটি সিংহভাগই তার পথের বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে। উপন্যাসে আরও অনেক চরিত্র থাকলেও অনিল চরিত্রটি কেন্দ্রিয়। পুরো উপন্যাস জুড়ে অনিল এবং তার পারিপাশির্^ক অবস্থার বর্ণনাতে মুক্তিযুদ্ধ সময়কালীন অবস্থার একটি চিত্র ফুটে উঠেছে। উপন্যাসের প্রথম দিকে অনিলকে বেশ ভীতু দেখা যায়। তবে উপন্যাসের কাহিনী এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে অনিল আর ভীতু থাকেনি। উপন্যাসের এক জায়গায় অনিল যখন তার বাবার মৃত্যু সংবাদের চিঠি নিয়ে ঐরকম একটি পরিস্থিতিতে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন তখন পথের মধ্যে একজন মিলিটারী অফিসার এবং একজন বিদেশি সাংবাদিকের সাথে তার কথা হয়।

বিদেশি সাংবাদিক তাকে ডেকে নিয়ে দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে অনিল তাকে নির্ভয়ে জানায়,’ স্যার, আপনি নিজে বুঝতে পারছেন না? আপনি কি রাস্তায় কোন শিশু দেখেছেন? আপনার কি চোখে পড়েছে হাসতে হাসতে, গল্প করতে করতে কেউ যাচ্ছে? শহরে কিছু সুন্দর সুন্দর পার্ক আছে। গিয়ে দেখেছেন পার্কগুলিতে কেউ আছে কি-না? বিকাল চারটার পর রাস্তায় কোন মানুষ থাকে না। কেন থাকে না? স্যার, আমার বাবা মারা গেছেন মিলিটারীর হাতে?’ এরপরও তার সাথে অনিলের কথা চলতে থাকে আরও কিছুক্ষণ। এরকম একটি পরিস্থিতি যেখানে অনিলের বাইরে বের হওয়াটাই বিপদজনক। সেখানে সে অবলীলায় পাকিস্থানী অফিসারের সামনে সত্য কথা বলে দিল। এই দৃশ্যটি সিনেমায় আমাকে বেশি আলোড়িত করেছে। একজন পাক সেনাবাহিনীর অফিসারের সামনে দাড়িয়ে অবলীলায় সত্যি কথা বলার সময় যে তীক্ষè অভিনয় শৈলির দরকার হয় তা পর্দার অনিলের ছিল। অনিলের বক্তব্য অনুযায়ী বাবার চিঠি বুকে নিয়ে সে মিথ্যা বলতে পারবে না। তাছাড়া যুদ্ধাবস্থা চলতে থাকা কোন দেশের পরিস্থিতি জানার জন্য আশেপাশে তাকালেই স্পষ্ট হওয়া যায় তাই বোঝানো হয়েছে। এই কথা কেবল এদেশের জন্য নয় বরং সারা বিশে^র যুদ্ধাবস্থা চলতে থাকা জাতির জন্যই সত্যি। একটি সমাজের প্রাণ হলো শিশু। সেই শিশুরা যদি কোন দেশের রাস্তাঘাট,পার্কে আনন্দ করতে না দেখা যায়, চলাচল করতে না দেখা যায়,মাঠে খেলতে না দেখা যায় তাহলে বুঝতে হবে সেখানে কোন বড় সমস্যা রয়েছে। উপন্যাসটিতে অনিলের বাবার দার্শনিকতা এবং অনিলের প্রতি গভীর আস্থা প্রকাশ পেয়েছে। কারণ তিনি জানতেন তার সন্তানের আর কোন গুণ তীব্র মাত্রায় না থাকলেও সততা নামক বিষয়টি তার মধ্যে রয়েছে পুরো মাত্রায়। তাই তিনি নিজেই তার সন্তানকে একটি প্রশংসাপত্র দিয়েছিলেন। যেখানে তার পুত্র সম্পর্কে খোলামেলা ভাবে সত্য বর্ণনা রয়েছে। অনিল যখন চাকরির ইন্টারভিউ বোর্ডে যায় এবং তারা প্রশংসাপত্র দেখতে চাইলেন তখন অনিল তার বাবার দেয়া প্রশংসাপত্র বোর্ডে দেখায়। যেখানে অনিলের প্রতি পূর্ণ আস্থা এবং বিশ^াসের প্রকাশ ঘটে। এই প্রশংসাপত্রের এক জায়গায় লেখা ” ঈশ^র মানুষকে পরিপূরক গুণাবলী দিয়ে পাঠান। সেই কারণেই আমার পুত্রের মেধার অভাব পূরণ করিয়াছে তাহার সততা। অন্য কোন গুণ আমি আমার ছেলের মধ্যে লক্ষ করি নাই। যাহা লক্ষ করিতেছি তাহাই বলিলাম”। এই প্রশংসাপত্রেই অনিলের চাকরি হয়েছিল। সিনেমায় এ দৃশ্যে প্রথমে একটু বিব্রত মনে হয়েছিল। কারণ নিজের বাবার দেয়া প্রশংসাপত্র ইন্টারভিউ বোর্ডে দেয়ার কথা আসলে কল্পনা মাত্র। কিন্তু অনিল এমন একটি চরিত্র যে যে কোনো পরিস্থিেিত সত্যি কথা বলে।

উপন্যাসে অনিল গ্রামের বাড়িতে রওনা হওয়ার পর যে বাসে ওঠে সেই বাসে আয়ুব আলি নামে একজনের সাথে ঘনিষ্টতা হয়। আয়ুব আলি চরিত্রটি একদিকে রাগী অন্যদিকে গভীর মমতার একটি চরিত্র। সে তার পরিবারের সাথে রাগ দেখায় অপরদিকে অনিল হিন্দু জেনে তাকে বাঁচানোর জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করে। এমনকি যখন মিলিটারী গাড়ি থামিয়ে এক এক করে জিজ্ঞাসাবাদ করে তখনও তিনি অনিলের নাম ’মোহাম্মদ মোহসিন’ দেন। এটা তিনি করেন শুধুই অনিলকে মিলিটারীর হাত থেকে বাঁচানোর জন্য। পর্দায় এই আয়ুব আলী চরিত্রটিকেও চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় আয়ুব আলী নামের মানুষেরাও নিজের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারেন সে দিকটি তুলে ধরেছেন। যেখানে নিজেরই ছিল বড় বিপদ। শেষদিকে যখন মিলিটারীরা অনিলকে ধরে নিয়ে যায় তখন আয়ুব আলি অনিলকে তার দিদিকে দেখার প্রতিজ্ঞা করেছিল। বিপদে যে একজন আরেকজনের পাশে এসে দাড়ায় এটা তার একটা উদাহরণ। মোট কথা বইয়ের পাতার অনিল এবং পর্দার অনিলের এক চমৎকার মিল রয়েছে যা বইটির পাঠকমাত্রই অনুভব করতে পারবেন।

অলোক আচার্য, শিক্ষক ও কলামিষ্ট, পাবনা।

পোষ্টটি 100বার পঠিত

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন

Check Also

ভালোবাসা নিয়ে বিখ্যাত লেখকদের উক্তি

বাংলাবাজার২১ : ভালোবাসা নিয়ে বিভিন্ন সময় বিশ্বের সেরা লেখকরা বিভিন্ন রকম উক্তি দিয়েছেন। শেক্সপিয়ার থেকে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *