বৃহস্পতিবার , ফেব্রুয়ারি ২০ ২০২০
Home / ফটোগ্যালারী / অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য ও শিল্পকলার চিন্তাধারা (মত ও মন্ত্র)
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য ও শিল্পকলার চিন্তাধারা

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য ও শিল্পকলার চিন্তাধারা (মত ও মন্ত্র)

ফণীন্দ্রনাথ রায় : শিল্পকে পাওয়া আর বাস্তব শিল্পকে পাওয়ার মানেতে তফাৎ আছে। বহির্জগতে কাল্পনিক প্রতিলিপিই চিত্র। মনোজগতে ধরা নানা বস্তুর যে স্মৃতি তার আলেখ্যই চিত্র। এই দুটোই মন্ত্র নয়। বাইরে যা দেখছি খুটে খুটে তার কপি নেওয়ার কিংবা চোখ উল্টে ভিতরের দিকে বাইরেই যে সব স্মৃতি রয়েছে জমা তার হুবহু তোলায় তফাৎ একটুও নেই দুটোই এক জাতির চিত্র। এও ছাপ, সেও ছাপ। কপি ছবি নয়। চোখের সামনে সূর্যোদয় আর অতীত সমস্ত সূর্যোদয়ের স্মৃতিচিত্র দুয়ের মধ্যেও না হয় রঙচঙের তফাৎ হল কিন্তু তাই বলে মনটা আর্ট আর অন্যটি আর্ট নয় স্মৃতির যথাযথ প্রতিলিপিত আর্ট সামনের যথার্থটা আর্ট নয়। কিংবা সামনেরটাই আর্ট আর মনেরটা অধিক তার উল্টো জিনিস এই তর্ক উঠতেই পারে না, কেননা যথাযথ প্রতিলিপি, তা সে এ পিঠেরই বা ওপিঠেরই হোক সে কপি। এবং যারা তা করেছে তারা নকলই করেছে। কেউ আসল করছে না। কেননা কল্পনা নেই দুজনেরই। কাজেই রচনা করল না তারা কেউ, সুতরাং আর্টিস্ট হবার দিকেও গেলো না। এরা নকলনবিস হয়ে রইল। কল্পনাশূন্য চোখের দেখা বা এইভাবে চোখের স্মৃতি শিল্প শব্দকল্পদ্রুম শিখতে হলে এর মানে দিক হবে গাছের জড় বা শিকড়। বাইরেটা এবং বাইরের সৃষ্টিটা শিল্পীর ভাণ্ডার শিল্পীর কল্পনালক্ষ্মী সেখান থেকে এটা ওটা নিয়ে নানা সামগ্রী বানিয়ে পরিবেশন করেন। যে গড়েছে বা আঁকছে তার মনের কল্পনার সংস্পর্শশূন্য ছবি ফলে এঁকেছে মানুষ হৃদয়ে গড়েছে, কেষ্টনগরের পুতুল ঘটনার যথা প্রতিরূপ। শিল্পের যতগুলো কৌশল নির্ভুলও সম্পূর্ণভাবে মেনে চলার কেষ্টনগরের কারিগরের গয়নাটি কিন্তু এই বাস্তবের নিয়ম চলার ফলে একটি গ্রীক প্রস্তর মূর্তির সঙ্গে কি ঘুরনী পাড়ার মাটির পুতুলটিকে সমান করে তুলতে পারলে, না এটাই প্রমাণ করলে যে মানুষ চেষ্টা করলে কলের চেয়ে নির্ভুল ও পরিপূর্ণ নকল নিতে পাকা পাকা হয়ে উঠতে পারে। বাস্তবের দিকে তথা বায়ু যেমন দেখা গেলো কল্পনাশূন্য। বাস্তব ছবি নেওয়া চললো বাহির জগতে, তেমন অন্তর্জগতের বাস্তব স্পর্শশূন্য নিযুক্ত কল্পনার একটা কিছু ধরবার চেষ্টা করা যায়। কিন্তু কোথায়ও তেমন জিনিস সত্যপীরের মাটির ঘোড়া পালাঘাটের পট নতুন বাংলার আমাদের ছবি, পুরোনো বাংলার নতুন বাংলা আমাদের ছবি, পুরোনো বাংলার দশভূজা এর একটাও নিযুক্ত কাল্পনিক জিনিস নয়। এরা সবাই বাস্তবকে ধরে তবে তো প্রকাশ হল। মন যে বস্তুকেই স্পর্শ করেই আছে, নানা বস্তুর নানা ভাবের ছবি জমা হচ্ছে মনে। নিছক কল্পনা সে মনেই উঠতো মনেই থাকতো। যদি না বাস্তব জগতের ভাব ও রূপের সংস্পর্শে সে আসতো। অসীমের কল্পনা তাও সীমার সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রকাশ পায়, সমুদ্রের অসীম বিস্তার ভাণ্ডার সীমারেখাতে এসে না মিললে ছবি হয় না। নকল বা তার সঙ্গে কল্পনার একটু যোগ নেই কিন্তু বাস্তব জিনিসের সঙ্গে আমার স্মৃতির সঙ্গে কল্পনার যোগ সসীম থেকে আরম্ভ করে অসীমের মধ্যে ওতপ্রোতভাবে দেখা যাচ্ছে এই চোখের সামনে যে বিদ্যমান সৃষ্টি এটার মূলে দেখি সৃষ্টির কল্পনা রয়েছে তাই এত বিচিত্র মনোহর। একটা গাছ আর একটার একটি ফুল আর একটির জীব আর এক জীবের একদিন আর একদিনের মত নয় নীল আকাশ একই চন্দ্র সূর্যকে নিয়ে পলে পলে আলো অন্ধকারে নতুন থেকে নতুন স্বপ্ন রচনা করে চলেছে চিরকাল ধরে, পুরোনো আর হয়ে যাচ্ছে না। এই পৃথিবীর শুধু এর পিছনে রচয়িতার কল্পনা ঐ সত্যপীরের ঘোড়া নয় অথচ ঘোড়াখানি ঘাটের পট যেটা প্রকৃতি নয়, কিন্তু শ্যামারূপ ধরেছে এটার ওটার সেটার রেখা নানা রঙ্গের, নানা আঁকা বাক্যের সাহায্যে এরাও সৃষ্টি, দেখতে কেউ কেউ সৃষ্টি, কেউ ভাল সৃষ্টি, কেউ হয়তো বা অনাসৃষ্টি। কিন্তু সৃষ্টি নকলের মতো প্রতিবিম্ব নয়।

যে শিল্পজগৎ সত্য কল্পনাদ্বারা সজীব নয় সে বুদবুদের উপর প্রতিবিম্বিত জগৎ চিত্রটির মতো মিথ্যা ও ভঙ্গুর দর্পণের উপরেই তার সমস্তখানি। কিন্তু দর্পণের কাচ কায়ার এবং বুদবুদের জলে বিন্দুটির যতটুকু সত্তা তাও তার নেই। রচনা যেখানে রচয়িতার স্মৃতি ও কল্পনার কাছে ধ্বনী সেখানেই সে আর্ট নয় আসলে নকল মাত্র।

হোমার মিল্টন দুই জনেই অন্ধ ও কবি কিন্তু বিদ্যমান ও অবিদ্যমানের দুয়েরই ঋণ বিষয়ে তারা ছিলেন না তারা বাস্তব কল্পনা করে গেছেন অন্ধ কল্পনা করেনি। কালিদাস ভবভুতি চক্ষুস্মান কবি, কিন্তু তারাও কল্পনা বাদে বাস্তব কিংবা বাস্তব বাদে কল্পনায় ছবি রেখে যাননি। গানে সুরে সম্পূর্ণ কাল্পনিক জিনিস কিন্তু এই বাস্তব জগতের বায়ূতরঙ্গের উপর তার প্রতিষ্ঠা হল, কথার ছবি- সঙ্গে সে আপনাকে মিলালে তবে সঙ্গীত হয়েও উঠলো অনাহত আপনাকে করল আহত বাতাস ধরে, কিন্তু হরবোলার বুলি বাস্তব জগতের সঠিক শব্দগুলোর প্রতিধ্বনি দিলে সেই জন্যে, সে সঙ্গিত হওয়া দূরের কথা, খুব নিকৃষ্ট যে টেপ্পা তাও হল না। বাস্তবকে কল্পনা থেকে কতখানি সরালো কিংবা কল্পনাকে বাস্তব থেকে কতটা হটিয়ে নিলে আর্ট হয়, এ তর্কের মিমাংসা হওয়া শক্ত। কিন্তু কল্পনার সঙ্গে বাস্তব চোখে দেখা জগতের সঙ্গে মনে ভাষা জগতের মিলন না হলে যে আর্ট হবার যো নেই। এটা দেখাই যাচ্ছে। ডান জনেস এই হলো ইংল্যান্ডের প্রসিদ্ধ চিত্রকর। ডান জনেস এর কথা অনেকদিন চিত্র এঁকে জ্ঞান লাভ করলেন শিল্পী তারি ফলে বুঝলেন যে বাস্তবতা ছবিতে কতখানি সয় তা বিষম মুশকিল ইংরেজ শিল্পী এখানে কোন মত ছিলেন না।

ছবি আঁকতে গেলে সবারই সে প্রশ্ন সামনে উদয় হয়। তাই লিখলেন- কিন্তু দেশের মত পেটুয়া সুলভ মন্ত্র ধরে চলাও যেমনি সাধারণ সে চিত্রবিদ তার সম্বন্ধে পরিষ্কার মত কি চিত্র তার বিষয়ে পাকা শেষ মত প্রচারিত হল এবং সেইসব মতের চশমা ভারতবর্ষের চিত্রকলার আদর্শগুলোর দিকে চেয়ে দেখে অজন্তায় শিল্প অজন্তার শিল্প শিল্পীও আমাদের শ্রদ্ধেয়। অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় মহাশয়ের চোখেও কি তা হতে পারলো, তার ছবি কার্তিক সংখ্যায় প্রবাসী কষ্টি পাথর তুলে নিলেম, যাহা ছিল তাহা নাই। যাহা আছে সেই অজন্তার গুহায় চিত্রাবলী তাহাতে যাহা আছে তাহা কিন্তু চিত্র নহে, সাহিত্য দর্পণের। শেষ পরিচ্ছেদের অনায়াসলভ্য তাহা কেবল বিলাসব্যসন মুক্ত যোগযুক্ত সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ের নিভৃত নিবাসের ভিত্তি বিলেপন। ভারতচিত্রেচিত প্রশংসা লাভের অনুপযুক্ত। তাহা এক শ্রেণীর পূর্তকর্ম তাহাতে যাহা বিছু চিত্রগুলোর পরিচয় পাওয়া যায় তাহা অযতœসূলভ আকস্মিক চিত্র, গুণের চিত্র এবং চিত্র দোষের যথাযথ পর্যবেক্ষণে যাহাদের চক্ষু অভ্যস্ত তাহাদের নিকট অজন্তার গুহাচিত্রাবলী ভারত চিত্রের অনিন্দ্য সুন্দর নিদর্শন বলিয়া মর্যাদা লাভ করিতে অসমর্থ। যাহাদের তুলিকা সম্পাতে এই সকল ভিত্তি চিত্র অঙ্কিত হইয়াছিল তাহারাও পুরাতন ভারতবর্ষের চিত্রবিৎ বলিয়া কথিত হইতে পারিবেন না। তাঁহারা নমস্য কিন্তু চিত্রে নহে চরিত্রে। তাঁহাদের ভিত্তি ও চিত্র প্রশংসাই কিন্তু কলা সাহিত্যে নহে। বিষয় মাহাত্যে (শ্রী অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় ভারত চিত্র চর্চা) চশমা দিয়ে দেখলে অজন্তার ছবিতে কোন চাঁদের মধ্যেও অপনিবতি ও কলঙ্ক দেখা যায় এবং সেই দোষ ধরে ধরে বিশ্বকর্মাকেও বোকা বলে উড়িয়ে দেওয়া চলে। কিন্তু সৃষ্টির প্রকাশ হল শ্রষ্টার অভিমতে শিল্পের প্রকাশ হল শিল্পীর অভিমতটি ধরে ব্যক্তির বিশেষের বা শাস্ত্র মত বিশেষের সঙ্গে না মেলাই তার ধর্ম, কাজেই কলঙ্ক ও অপরিণতি যেমন হয়, চাঁদের পক্ষে শোভার কারণ শিল্পের পক্ষেও ঠিক ঐ কথাটাই খাটে। চিত্র ষড়ঙ্গের কতখানি পরিপূর্ণতা পেলে চিত্র হবে চিত্রাভাস হবে না। মডেল ড্রইং কতখানি সঠিক হলে তবে অজন্তার ছবিকে বলব চিত্র আর কতখানি কাঁচা থাকলে অজন্তার চিত্রাবলী হবে চিত্র সাহিত্য দর্পণের দোষ পরিচ্ছেদের অনায়াস লভ্য উদাহরণ তা কঠিন, তবে পাশা ড্রইং হলেই যে সুন্দর চিত্র হয় না, এটা বিখ্যাত ফরাসী রোদা বলেছেন। আদর্শ জিনিসটি নিছক অবিদ্যমান জিনিস, বস্তুত তার সঙ্গে পুরোপুরি মিলন অসম্ভব ধর্মেকর্মে শিল্পে সমাজে ইতিহাসে কোন দিক দিয়ে কেউ মেলেনি, না মেলাই হল নিয়ম। সৃষ্টিকর্তার নিরাকার আদর্শ যা আমরা কল্পনা করি তার সঙ্গে সৃষ্ট বস্তুগুলো এক হয়ে মিললে সৃষ্টিতে প্রলয় আসে, তেমনি শাস্ত্রের আদর্শ গিয়ে শিল্পে মিললে শিল্প লোপ পায়, যাকে শুধু শাস্ত্রের পাতায় লেখা ভারতশিল্পের দুছত্র শ্লোক মাত্র।

এমনকি শিল্পিকে পর্যন্ত সঠিক মেপে নেওয়া চলে কিন্তু শিল্পরস যে অপরিমেয় অনির্বচনীয় জিনিস, শাস্ত্রের বচন দিয়ে তার পরিমাপ করবে কে? অলঙ্কার শাস্ত্রের গোড়াপত্তন করলেন নিয়তিকৃত নিয়ম রহিতা আনন্দের সঙ্গে একীভূত অনন্য পরিতন্ত্রর নব রস রুচিরা নির্মিত ধারিণী যে কবি তার জয়। শুধু ভারত শিল্পের জন্যে নয় কাব্যচিত্র, ভাস্কর্য, সঙ্গীত, নাট্য, নৃত্য সব দেশের সব শিল্পের সবার জন্যে এই মন্ত্রপূত সোনার পঞ্চ প্রদীপ ভারতবর্ষ ছেড়ে যে মানুষ একদিনও যায়নি সে জ্বালিয়ে গেছে। মতের ফুৎকারে এ কোন দিন নেভার নয়। কেননা রস এবং সত্য এই দুই একে অমৃতে সিঞ্জিত করেছে। সূর্যের মতো দীপ্যমান এই মন্ত্রে এর আলোয় সমস্ত শিল্পেরই ভূত ভবিষ্যত বর্তমান, কল্পনা রাজ্য ও বাস্তব জগৎ যেমন পরিষ্কার করে দেখা যায় এমন আর কিছুতে নয়। মতগুলো আলেয়ার মতো বেশ চকমকে ঝকঝকে, কিন্তু আলো দেয় যেটুকু তার পিছনে অন্ধকার এত বেশি যে সেই আলেয়ার পিছনে চলতে বিপদ পদেপদে। শিল্প সম্বন্ধে বা যে কোন বিষয়ে যখন মানুষ মত প্রচার করতে চায়, তখন সৃষ্টি ছাড়া আদর্শ আকড়ে না ধরলে মতটা জোর পায় না। খোটার জোরে মেড়া নড়ে। শিল্প বিষয়ে মত যারা দিলেন তাদের কাছে আদর্শই হল মূখ্য বিষয়। আর শিল্পটা হলো গৌন। শিল্পে তন্ত্রগুলো তা নয়। শিল্পকে মূখ্য রেখে তারা উচ্চারিত হলো। এই মত থেকে দেখি ভারত শিল্প, মিশর শিল্প, চীন শিল্প, পাশ্চাত্য শিল্প, প্রাচ্য শিল্প, এখানে শিল্পে শিল্পে ভিন্ন শিল্পীতে ভিন্ন ভাই ভাই ঠাঁই ঠাঁই। কারু মতে বেড়াল চোখ, কারু মতে পদ্ম আঁখি, কারু মতে সাদা, কারু মতে কালো হল ভাল। কিন্তু এই রকমের ও সৌন্দর্যের যে মন্ত্র স্তন্য ধারার মতো বিভিন্ন শিল্পকে এক করেছে সেটি প্রাণের রাস্তা চলে ধরেছে মতের এতটুকু নালা ক্ষেত্রে নয় কাজেই সে ধারা দিয়ে শিল্পের বড় দিকটাতেই আমাদের নজর পড়ে। শিল্পের আপসার একটা যে জগৎজোড়া আদর্শ রয়েছে তাকেই লক্ষ্য করে চলেছে এযাবৎ সব শিল্পী সব শিল্প তাই রক্ষে। না হলে শাস্ত্রের মতের পেষণে শিল্পকে ফেললে একদিনে শিল্প ছাতু হয়ে যেতো। যে সমস্ত শিল্প সম্ভূত হয়ে গেছে তাদের আজকের দিনে আবার সম্ভব করে তোলবার চেষ্টা। যে একবার জন্মেছে তাকে পুনরায় জন্মগ্রহণ করাবার চেষ্টার মতোই পাগলামি। বিদ্যমান ছবি যা বাতাসের মধ্যে আলোর মধ্যে সৃষ্টি করি বিরাট কল্পনার প্রেরণায় আশ্চর্য রূপ পেয়ে এসেছে যাকে চার কোণা এতটুকু অগ্নি শিখাকে যতই সঠিক নকল কর সে আলো দেবে না, তাপও দেবে না। শুধু একট সাদৃশ্য দেবে। যদি ঝড়–গতিতে পতাকা বিচলন দেখাতে পারলেই যদি মানুষ শাস্ত্রমতে চিত্রবিদ হত, তবে যারা তাকে এবং ছবি দেখে সবাইকে বায়স্কোপের কর্তার পায়ে তলায় মাথা নোয়াতে হতো।

শিল্পীর কল্পনায় শিল্পের জিনিস আগুন হয়ে জ্বলে, বাতাস হয়ে বয়, জল হয়ে চলে, উড়ে আসা মনের দিকে সোনার ডানা মেলে নিয়ে চলে বিদ্যমান ছাড়িয়ে অবিদ্যমান কল্পনা ও রসের রাজত্বে দর্শক ও শ্রোতার মনে- এই জন্যেই শিল্পের গৌরব করে মানুষ। এখনকার ভারত শিল্পের সাধনা অনাগত অজ্ঞাত যা তারি সাধনা না হয়ে যদি পূর্বগত প্রাচীন ও আগত আধুনিক এবং সম্ভুত শিল্পের আরাধনাই হয় সবার মনে তবে কলাদেবীর মন্দিরে ঘণ্টাধ্বনি যথেষ্ট উঠবে কিন্তু এক লহমার জন্যেও শিল্প দেখা সেখানে দেখা দেবে না। বিদ্যমান যে জগৎ তাকে প্রতিচ্ছবি দ্বারা বিদ্যমান করা মানে পুনরুক্তি দোষে নিজের আর্টকে দুষ্ট করা। বিদ্যমান জগৎ বিদ্যমানই তো রয়েছে, তাকে পুনঃ পুনঃ ছবিতে আবৃত্তি করে ড্রইং না হয় মানুষ পেলে, রূপকে চিনতে শিখলে রংকে ধরতে শিখলে কিন্তু এ তো প্রথম পাঠ। এখানে যে ছেলে পড়া শেষ করলে সে কি শিল্পের সবখানি পেলো? অথবা মানুষের চেষ্টা আর কল্পনাতেই রয়ে গেলো, অবিদ্যমান অবস্থাতেই সুখের স্বপ্ন দর্শনের মতো হল ছেলেটির দশা। অন্ধের রূপকল্পনার মতো অবিদ্যমানকে বিদ্যমানের মধ্যে ধরতে সক্ষম রইলো। সে নির্বাক ও চক্ষুহারা? একেই রইল বাইরে বাঁধা অন্যের রইলো ভিতরে বাঁধা। শিল্পকে জানতে হলে যেখানে থেকে কেবল মাত্র বার হচ্ছে সেই গেলে আমাদের চলবে না।

যিনি এই চিত্রের রচয়িতা যিনি সত্য সূত্রধর শ্রেষ্ঠ সে চিত্রের সহিত চিত্র যাকেও নিল বিচার করে। বিদ্যমান এই যে জগৎচিত্র তার উৎপত্তির স্থান অবিদ্যমানের মধ্যে চিত্রের রহস্য রূপ রেখায় প্রকাশ করলেন ঋষিরা। ঘটনের মূলে রচনের মূলে শিল্পের মূলে শিল্পী না শাস্ত্র এ বিষয়ে পরিষ্কার কথা বললেন ঋষি সবেট নিমোষো জুলিয়ে বিদ্যুতের পুরু কাজটি কল্পনাতীত প্রদীপ্ত পুরুষ নিমেষে নিমেষে ঘটনা সমস্ত জানা, চিনি। হংস এলো সাদা হয়ে, শুক এলো সবুজ হয়ে, ময়ুর এলো বিচিত্র হয়ে। তারা সেইভাবেই ভাষাচিত্রের মধ্যে গত হয়েই রইল, অবিদ্যমান জানতে পারলে না। রচনাও করতে পারলে না কল্পনাও করতে চাইলেন না। মানুষ মনের মধ্যে ডুব দিয়ে অবিদ্যমানের মধ্যে বিদ্যমানকে ধরলে, সে হল শিল্পী, তা রচনা করলে চিহ্ন বর্জিত যা ছিল তাকে চিহ্নিত করলে পাথরের রেখায় রঙের টানে সুরের মীড়ে গলার স্বরে। বর্ষার মেঘ নীল পায়রার রঙ ধরে এলো, শরতের মেঘ সাদা হাসের হালকা পালকের সাজে সেজে দেখা দিলে কচি পাতা সবুজ ওড়না উড়িয়ে এলো বসন্তে নীল আকাশের চাঁদ রূপের নূপুর বাজিয়ে এলো জলের উপর দিয়ে। কিন্তু তাদের এই অপরূপ সাজ দেখতে যে সেই সব চক্ষু এলো নিরাভরণ নিরাবরণ। চিত্র তাকে পীড়া দেয়, রৌদ্র তাকে দগ্ধ করে, বাস্তব জগৎ তার উপরে অত্যাচার করে, বিশ্বচরাচরে রহস্যের দুর্লব্ধ প্রাচীরের মধ্যে তাকে বন্দী করতে চায়- এই মানুষ স্বপ্ন দেখলো অগোচরের অবাস্তবের অজানার সেই দেখার মধ্যে দিয়ে দৃষ্টি বদল করে নিলে সৃষ্টির বাইরে এবং সৃষ্টির অন্তরে যে তার স্েঙ্গ অদ্বিতীয় শিল্পী অপরাজিত প্রতিনিধি মানুষ জগতের অধিকারী বাহির জগতের প্রভু।

পোষ্টটি 937বার পঠিত

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন

Check Also

রুদ্র অয়নের গল্প “কালো ছেলে”

টিউশনি করানোর চতুর্থ দিনের মাথায় ছাত্রীর মা অনিককে ডেকে হাতে কিছু টাকা দিয়ে বলল, ‘কাল …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *