বৃহস্পতিবার , ফেব্রুয়ারি ২৭ ২০২০
Home / সাহিত্য / সাক্ষাতকার / আঞ্চলিক ভাষার শক্তি সাহিত্য সমৃদ্ধ করবে : ইমদাদুল হক মিলন

আঞ্চলিক ভাষার শক্তি সাহিত্য সমৃদ্ধ করবে : ইমদাদুল হক মিলন

বাংলাবাজার২১ : লেখালেখির শুরু থেকেই অবলীলাক্রমে নিজের লেখায় ঢাকা-বিক্রমপুর অঞ্চলের ভাষা ব্যবহার করেছি আমি।

আমার প্রথম উপন্যাস ‘যাবজ্জীবন’। সেই উপন্যাস থেকেই শুদ্ধ বাক্যের ভিতরেই আমি আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহার করে আসছিলাম।

বিক্রমপুরের আঞ্চলিক ভাষায় সম্পূর্ণ একটি উপন্যাস লিখেছিলাম ‘কালাকাল’ নামে। ‘ভূমিপুত্র’ কিংবা ‘কালোঘোড়া’, ‘নদী উপাখ্যান’ কিংবা ‘রূপনগর’ আর গ্রামজীবনবিষয়ক গল্পগুলোয় যথেচ্ছ ব্যবহার করেছি আঞ্চলিক ভাষা।

‘নূরজাহান’ তিন পর্বের সাড়ে বারো শ’ পৃষ্ঠার উপন্যাস। বলতে গেলে পুরো উপন্যাসটিই আঞ্চলিক ভাষায় লেখা। বাংলাদেশে বইটির অনেক সংস্করণ হয়েছে। কলকাতার আনন্দ পাবলিশার্স ‘নূরজাহান’ অখণ্ড সংস্করণ প্রকাশ করেছে দুবছর আগে।

এক হাজার রুপি দামের বই মাত্র এক বছরে তিনটি সংস্করণ হয়েছে। বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের বহু পাঠক চিঠি লিখে বা মুখোমুখি হয়ে আমাকে জানিয়েছেন, আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারের কারণে উপন্যাসটি পড়তে তাদের বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয়নি।

একসময় গ্রামজীবননির্ভর গল্প-উপন্যাসে শুধু সংলাপের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করা হতো। কোনো কোনো লেখক সেই প্রথার বাইরে এসে বর্ণনার মধ্যেও আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহার করতে শুরু করেন।

পাঠক বিস্মিত হয়ে লক্ষ করেন তাতে ভাষার কোনো ক্ষতি হওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না, বরং সমৃদ্ধ হচ্ছে বাংলা ভাষা। নতুন নতুন শব্দ যুক্ত হচ্ছে এই ভাষায়। পৃথিবীর সব ভাষাতেই প্রতিদিনই কিছু না কিছু নতুন শব্দ ঢুকে যাচ্ছে।

যেমন ভারতীয় ইংরেজি ভাষার লেখকরা তাদের লেখায় হিন্দি শব্দ ব্যবহার করছেন ইচ্ছে মতো। নতুন নতুন শব্দের ব্যবহার সব ভাষাকেই বলিষ্ঠ করে।
বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষাগুলো নিজ নিজ মাহত্ম্যে উজ্জ্বল হয়ে আছে। আমি যদি আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের উপন্যাস দুটোর কথা বলি, ‘চিলেকোঠার সেপাই’ উপন্যাসে ঢাকায়া ভাষা ব্যবহার করলেন তিনি।

‘খোয়াবনামা’য় করলেন বগুড়া অঞ্চলের ভাষা। পাঠক নিশ্চয় আমার সঙ্গে একমত হবেন, এই ভাষা ব্যবহারের কারণে উপন্যাস দুটোর উচ্চতা অনেকখানি বেড়েছে এবং নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। আমার এবারের একমাত্র উপন্যাসটির নাম ‘একাত্তর ও একজন মা’।

চারজন মানুষের জবানীতে লেখা হয়েছে উপন্যাসটি। মা যখন তার জায়গা থেকে গল্প বলে যাচ্ছেন, তখন ভাষাটি আঞ্চলিক, বড় ছেলে যখন বলে যাচ্ছে, তখন তার বয়ানের কোথাও কোথাও আসছে আঞ্চলিক শব্দ। বোন যখন বলে যাচ্ছে, তখন ভাষাটি প্রায় পরিশীলিত। আর যখন আরেকটি ছেলে বলে যাচ্ছে, তখন পুরোটাই পরিশীলিত ভাষা। কারণ এই ছেলেটি সাহিত্য পড়া ছেলে। তবে সংলাপের ক্ষেত্রে প্রত্যেকের ভাষাই আঞ্চলিক।

এখন কেউ যদি আমাকে প্রশ্ন করেন এরকম ভাষা ব্যবহারের কারণ কী? উত্তরে আমি বলব, আমরা যারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ, আমরা যখন ঘরোয়া কথাবার্তা বলি, তখন কি পুরোটাই পরিশীলিত বাংলায় বলি? না, তা বলি না। বলি নিজের এলাকার ভাষায়। ঠিক এই পদ্ধতিটাই ‘একাত্তর ও একজন মা’ উপন্যাসে আমি ব্যবহার করেছি। সুতরাং আমি মনে করি, বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার শক্তি অনেক। যত্ন করে সাহিত্যে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করতে পারলে বাংলা ভাষা এবং সাহিত্য অনেক অনেক সমৃদ্ধ হবে।

অনুলিখন : শুচি সৈয়দ, সূত্র : যুগান্তর

পোষ্টটি 123বার পঠিত

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন

Check Also

ভালোবাসা নিয়ে বিখ্যাত লেখকদের উক্তি

বাংলাবাজার২১ : ভালোবাসা নিয়ে বিভিন্ন সময় বিশ্বের সেরা লেখকরা বিভিন্ন রকম উক্তি দিয়েছেন। শেক্সপিয়ার থেকে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *