বৃহস্পতিবার , ফেব্রুয়ারি ২০ ২০২০
Home / ফটোগ্যালারী / ইতিহাস হচ্ছে মানব জীবনের আখ্যান : সোনিয়া নিশাত আমিন

ইতিহাস হচ্ছে মানব জীবনের আখ্যান : সোনিয়া নিশাত আমিন

বাংলাবাজার২১ // গবেষণা ও প্রবন্ধ সাহিত্যে বিশেষ অবদান রাখায় ‘অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার ১৪২২’ পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সোনিয়া নিশাত আমিন। ইত্তেফাক সাময়িকী সম্প্রতি মুখোমুখি হয়েছিল তাঁর। সাক্ষাত্কারে উঠে এসেছে তাঁর পড়াশোনা, পেশা, গবেষণা, ভবিষ্যত্ পরিকল্পনাসহ নানা প্রসঙ্গ। সাক্ষাত্কার গ্রহণ হাসান শাওন

ইতিহাস পাঠে আগ্রহী হলেন কেন?:
আমি ছোটবেলা থেকেই মানব সভ্যতা সম্পর্কে জানতে চাইতাম। আমার দুটি আগ্রহের জায়গা ছিল। একটি সাহিত্য অন্যটি মানব সমাজ। আমি ও লেভেল পাশ করলাম। এরপর হলিক্রস কলেজে ভর্তি হলাম। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় বিষয় নির্ণয়ের সময় এল সামনে। তখন আমি বুঝতে পারলাম, আমাকে হয় সমাজ বিজ্ঞান নয় ইতিহাস পড়তে হবে।

ইতিহাসে আমি অনেক কাব্যময়তা দেখি। ছোটবেলা থেকেই ইতিহাস আমার কাছে শুধু সন, তারিখ, রাজা, যুদ্ধ-বিগ্রহ, সন্ধি—এসব ছিল না। আমার কাছে ইতিহাস হচ্ছে মানব-মানবীর জীবনযাত্রার আখ্যান। পরে যখন পরিণত বয়সে ইতিহাস পড়লাম তখন তা-ই তো দেখলাম।

পেশা হিসেবে শিক্ষকতাকে কেন বেছে নিলেন?:
এটা কোনো সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত ছিল না। সেই যুগে একটু গতানুগতিক চিন্তাধারার অনুসারী ছিলাম মনে হয়। সে-সময় কোনো ক্যারিয়ার কাউন্সিলিংয়ের সুযোগ ছিল না। এটা জানতাম আমি চাকরি করব; বাসায় বসে থাকব না। আমি ডাক্তার হইনি ইঞ্জিনিয়ারও হইনি। কর্পোরেট ব্যক্তিও হতে চাই না। হাতের কাছে মনঃপূত পেশা ছিল শিক্ষকতা। তাই এ পেশায় চলে আসি। এছাড়া আমার আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল পরবর্তী প্রজন্মকে বোঝা। তাদের কাছ থেকে শেখা। এটা আমার ইচ্ছা ছিল। আমার কষ্টার্জিত জ্ঞান তরুণদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার একটি বাসনাও আমার ছিল।

ঔপনিবেশিক কাল আপনার গবেষণার একটি প্রধান বিষয়। এটি কেন?:
আমাদের ইতিহাসে মূলত ৩টি বিষয় ছিল। প্রাচীনকাল, মধ্যযুগ, আধুনিক কাল। আরো ছিল ইউরোপ, আমেরিকা, দূর প্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া। এসব বিষয়ের গভীরে যেতে হলে ইংরেজি ভাষা ছাড়া একটি ভাষা ভালোভাবে জানা লাগত। সেটি ফ্রেঞ্চ বা স্প্যানিশ হতে পারে। আমার তা জানা ছিল না। আমাদের সমাজ বোঝার জন্য ঔপনিবেশিক কালটা বোঝা জরুরি। আধুনিকতার উত্স হচ্ছে ঔপনিবেশিক আমল। তাই এটি জানা আমার জন্য জরুরি মনে হয়েছে।

আপনার ক্যামব্রিজে পড়ার সুযোগ হয়েছিল, সে অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চাই।:
এটি ১৯৭৭ সালের ঘটনা। আমার মনে হলো বিশ্বের সেরা একটি বিদ্যাপ্রতিষ্ঠানে আমার পড়া উচিত। তখন বিদেশ যাওয়া এখনকার মতো সহজ ছিল না। আমি আবেদন করলাম। আংশিক স্কলারশিপও পেলাম। এভাবেই আমার সেখানে পড়তে যাওয়া। সেখানে খুব ভালো কেটেছিল তখন। একা হয়ে গিয়েছিলাম। ক্যামব্রিজ খুব অহঙ্কারী জায়গা। আমি ইংরেজি সাহিত্য পড়েছি ছোট থেকেই। তাই ক্যামব্রিজে এসে মনে হলো, আমি আমার জায়গাতেই এসেছি। এখানে শেলি, কিটস, বায়রন, মিল্টন সবাই ছিলেন। আমি যেখানে থাকতাম সেখানে একটি রাস্তার নাম ছিল মিল্টন ওয়াক। এখানে কবি জন মিল্টন হাঁটতেন। আমি যখন সকালে ডরমেটরি থেকে ক্লাসে যেতাম তখন দেখতাম স্টিফেন হকিংকে হুইল চেয়ারে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। যদিও তিনি তখন এতটা খ্যাতিমান ছিলেন না। আমি নাটক দেখতাম। ঘুরতে যেতাম। বাসার সবাইকে খুব মনে পড়ত। কিন্তু ক্যামব্রিজের পরিবেশ আমার খুব ভালোই লেগেছে।

আপনার গবেষণায় নারীরা প্রাধান্য পেয়েছে—বিষয়টা একটু ব্যাখ্যা করবেন?:
ছোটবেলা থেকেই স্বাধীনচেতা ছিলাম। আমার পরিবার আমাকে অনেক স্বাধীনতা দিয়েছিল। নারীরা শুধু সেজেগুজে থাকবে। ঘরে বসে শুধু গৃহস্থালী কাজ করবে—এটা আমি ছোট থেকেই মেনে নিতে পারতাম না। নারীর নিজস্ব সত্তা আছে। সে নিজের আত্মসম্মান নিয়ে দাঁড়াতে পারে—এটি আমি বিশ্বাস করতাম। নিজেকে আত্মাহুতি দিয়ে আমি কিছু পেতে চাইনি। এরপর যত বড় হয়েছি, নারীর অধিকার নিয়ে তত সচেতন হয়েছি। আমার গবেষণায় এজন্যই নারীরা প্রাধান্য পেয়েছে।

আমাদের সমাজে নারীরা কতটুকু এগিয়েছে?:
সংখ্যার দিক দিয়ে নারীরা এখন অনেক এগিয়েছে। বিভিন্ন পেশায় নারীদের দেখছি। রাষ্ট্র পরিচালনায়ও নারীরা আছেন। আমাদের ওয়াসফিয়া নাজনীন পর্বত জয় করে চলেছেন। এটি আমাদের জন্য অনেক গর্বের। কিন্তু শ্রেণি হিসেবে নারীরা কতটুকু এগিয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন করা যেতে পারে। নারীশিক্ষার হার বেড়েছে। কিন্তু সচেতন হয়েছে কতজন। আগে নারীরা দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ত। এখন হয়তো ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ছে। তবে যৌতুক এখনো আছে। তবে আমি হতাশ নই। সামনের দিনে নারীরা এগিয়ে যাবেই।

পুরস্কার আপনাকে কিভাবে অনুপ্রাণিত করে?:
ছোটবেলায় যখন স্কুলে পুরস্কার পেতাম তখন ভালো লাগত। এখনো পুরস্কার পেতে ভালো লাগে। ‘অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার’ পেয়ে সম্মানিত বোধ করেছি। আমি অনেক কষ্ট করে কাজ করেছি। এর স্বীকৃতি পেতে ভালো লাগে। আমার গবেষণা অন্যের কাজে আসবে ভেবে ভালো লাগছে।

ভবিষ্যতে কী নিয়ে কাজ করবেন বলে ভাবছেন?:
আমি গবেষণা চালিয়ে যাব। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রধান। আমাকে নানা প্রশাসনিক কাজে সময় দিতে হয়। তবে আমি মনে করি, আমার অনেক সময় গবেষণায় চলে গেছে। এখন একটু ভ্রমণ করতে চাই। কবিতা পড়তে চাই। বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের কথা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে চাই। এজন্য আমি ইংরেজিতেও লিখে যেতে চাই। – ইত্তেফাক

পোষ্টটি 98বার পঠিত

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন
  • 4
    Shares

Check Also

রুদ্র অয়নের গল্প “কালো ছেলে”

টিউশনি করানোর চতুর্থ দিনের মাথায় ছাত্রীর মা অনিককে ডেকে হাতে কিছু টাকা দিয়ে বলল, ‘কাল …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *