বৃহস্পতিবার , ফেব্রুয়ারি ২০ ২০২০
Home / ফিচার / ভ্রমণ / উতমা ছড়ার পথে

উতমা ছড়ার পথে

সুমন্ত গুপ্ত : সবাই তাকিয়ে দূর আকাশের পানে। যেখানে রোদ খেলা করছে পাহাড়ের গায়ে। শুরুটা যেমন-তেমন ধুপাগুলের কাছাকাছি যেতেই রাস্তাটা হঠাৎ খাল-বিল-নদী-নালায় রূপ পেল।

একটু আগেও খটখটে রোদ ছিল। এখন আবার মুখ কালো করে বসে আছে। আমরা চারজন বেরিয়েছি নতুন গন্তব্যে। আজকের ভ্রমণের মূল পথনির্দেশক হলো ইমরান আহমদ হেলাল। ইমরানের বাড়ি সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের নোয়াগাঁও। অনেক দিন ধরে বলছিল উতমা ছড়ার কথা। যাব যাব করে ব্যাটে-বলে মিলছিল না। শেষ পর্যন্ত আমরা রওনা দিলাম। সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার উত্তর রনিখাই ইউনিয়নে উতমা ছড়ার অবস্থান। সিলেট শহর থেকে আম্বরখানা মালনীছড়া চা বাগান ধরে আমরা এগিয়ে চলছি। সবাই তাকিয়ে দূর আকাশের পানে। যেখানে রোদ খেলা করছে পাহাড়ের গায়ে। শুরুটা যেমন-তেমন ধুপাগুলের কাছাকাছি যেতেই রাস্তাটা হঠাৎ খাল-বিল-নদী-নালায় রূপ পেল। আমাদের গাড়ি হঠাৎ করে কাদার মাঝে আটকা পড়ে। অগত্যা গাড়ি থেকে নেমে পড়তে হয়। হেঁটে হেঁটে কিছুটা পথ পার হই। আমরা সালুটিগড় হয়ে যখন থানার বাজারের পথে প্রবেশ করি তখন থেকেই বাকিটা পথ স্বপ্নের মতো! সরু রাস্তার দু’পাশের সবুজ ধানক্ষেত দেখতে দেখতে হঠাৎ যখন সুদূরের পাহাড়গুলো দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, তখনই স্বপ্নের শুরু। আরে! আকাশটাও বদলে গেছে! উজ্জ্বল নীল আকাশ আর তার শরীরে সাদা মেঘ নানা ভঙ্গিমায় নৃত্যরত। পাহাড়ে এসে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছে মেঘ। দিগন্তরেখায় মেঘ আর পাহাড়ের পারস্পরিক ভালোবাসা দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। ইমরান আমাদের আশ্বস্ত করে- পাহাড়ের যত কাছে যাবেন, ততই ভালো লাগবে। আমাদের ভালো লাগতে শুরু করেছে। কিছুদূর যেতেই পৌঁছে যাই ধলাই সেতুতে। যার নিচে দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে ধলাই নদী। সামনে মেঘালয় পর্বতমালা। কোল ছুঁয়ে বয়ে চলেছে ধলাই নদী। সে এক দৃশ্য বটে! এককথায় অসাধারণ। এমন দৃশ্যে চোখ-মন দুটিই ভরে ওঠে। নদীর বাঁ পাশে পানি আর ডান পাশে বিশাল বালিয়াড়ি। পুরো পরিবেশ অপরূপ। তবু বালুচরে ঘেরা এমন ম্রিয়মাণ ধলাই নদী দেখে দু’চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। আমরা দয়ার বাজারের পথ ধরে এগিয়ে চলেছি। তারপর ভাটরার গ্রামে এসে দেখা মিলল প্রায় শতবর্ষ পুরনো এক স্কুলঘরের। এবার ভাটরার গ্রাম পেছনে ফেলে প্রায় আধঘণ্টা পর চড়ার বাজারে পৌঁছি। চড়ার বাজারে আমাদের যাত্রাবিরতি টানতে হয়। কেননা প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে আমরা পথ চলছি। পেটে কিছু পড়েনি, এবার পেটে কিছু দেওয়ার পালা। তেমন ভালো মানের কোনো হোটেল নেই। কিন্তু কিছুই করার নেই। রাস্তার পাশের দোকান থেকে গরম গরম ভাত আর মুরগির ঝালফ্রাই খেলাম। পেটে খুব খিদে ছিল তাই খাবার অমৃতের মতো মনে হচ্ছিল। আবার যাত্রা শুরু করলাম। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা পৌঁছে গেলাম টলির ঘাটে, সেখান থেকেই উতমা ছড়ার শুরু। সারি সারি পাহাড়, পাহাড়ের বুকে গাঢ় সবুজের আস্তরণ। ঝরছে শীতল স্বচ্ছ জলরাশি- আছে পাথর ছড়ানো সর্বত্র। আমি একের পর এক ছবি তুলতে থাকলাম। আকাশে নীলিমার ছোঁয়া আবার কখন কালো মেঘের মায়া- এসব সঙ্গী করে আমরা উপভোগ করছি প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য। রূপ-লাবণ্যে যৌবনা উতমা ছড়া পরতে পরতে সাজিয়ে রেখেছে সম্মোহনী সৌন্দর্য। যান্ত্রিক কোলাহল থেকে মুক্ত নির্জন অরণ্যের সাহচার্য পেতে উতমা ছড়ার বিকল্প নেই। আছে সবুজের সমারোহ, দিগন্তবিস্তৃত সাদা মেঘের খেলা, পাথর ছড়ানো চারপাশ, দুধসাদা জলরাশি, পাখিদের কলতান। মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই! উতমাছড়ার সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি ধরা দেয় বর্ষাকালে। অন্যান্য মৌসুমে উতমা ছড়াকে মরুভূমির বুকে গজিয়ে ওঠা উদ্যানের মতো মনে হয়। দেখতে দেখতে গোধূলিলগ্নে আমাদের ফেরার সময় হয়ে এলো। আমরা আবার ফিরে চললাম শহর পানে। সঙ্গী হয়ে রইল উতমাছড়ার সম্মোহনী সৌন্দর্য।

যাওয়ার পথ : ঢাকা থেকে বাস বা ট্রেনে সিলেটের ভাড়া জনপ্রতি ৪৫০ থেকে ১২০০ টাকা। সিলেট মহানগরীর আম্বরখানা পয়েন্ট থেকে সরাসরি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় যেতে হবে ৩৫ কিলোমিটার দূরবর্তী দয়ারবাজারে। সড়কের অবস্থা তেমন ভালো না হওয়ায় সড়ক পাড়ি দিতে গুনতে হবে জনপ্রতি ১৮০-২০০ টাকা। দয়ারবাজার থেকে আবার সিএনজিচালিত অটোরিকশায় আট কিলোমিটার দূরে চড়ারবাজারে যেতে হয়। এ জন্য জনপ্রতি ভাড়া ২৫-৩০ টাকা পড়বে। চড়ারবাজার থেকে ১৫ মিনিটের মতো হাঁটলেই পেয়ে যাবেন উতমাছড়ার দেখা। অথবা সরাসরি মাইক্রো বাস নিয়ে যেতে পারবেন। তবে বর্ষার সময় দ্বিগুণ ভাড়া গুনতে হবে- ৪০০০ থেকে ৫০০০ টাকা। গাড়ির জন্য :০১৭১৭৬৭৪৩১০, ০১৬১৭৬৭৪৩১০।

পোষ্টটি 105বার পঠিত

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন
  • 1
    Share

Check Also

রুদ্র অয়নের গল্প “কালো ছেলে”

টিউশনি করানোর চতুর্থ দিনের মাথায় ছাত্রীর মা অনিককে ডেকে হাতে কিছু টাকা দিয়ে বলল, ‘কাল …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *