বৃহস্পতিবার , ফেব্রুয়ারি ২০ ২০২০
Home / ফটোগ্যালারী / সমরেশ মজুমদারের মুখে জীবন ও সৃষ্টির গল্প
জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক সমরেশ মজুমদার। পাশে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ

সমরেশ মজুমদারের মুখে জীবন ও সৃষ্টির গল্প

দীপন নন্দী : গল্পকথকের সঙ্গে আড্ডা। গল্পের ছলে শোনালেন চরম বাস্তবতার কথা। রসিকতাও করলেন বন্ধুর মতো। সব মিলিয়ে যাপিত জীবন ও সাহিত্য জীবনকে এক সুতোয় গেঁথে দেড় ঘণ্টার আলাপনে দুই বাংলার জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক সমরেশ মজুমদার মুগ্ধ করে রাখলেন পাঠক, ভক্ত, অনুরাগীদের। গতকাল শনিবার রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের অষ্টম তলায় বাতিঘরের আয়োজনে তাকে নিয়ে অনুষ্ঠিত হলো ‘আমার জীবন, আমার রচনা’ শীর্ষক আলাপচারিতা।

প্রায় পাঁচ হাজার বর্গফুটের বাতিঘর, পুরোটা পরিপূর্ণ হয়ে যায় সমরেশ মজুমদার মঞ্চে দাঁড়ানোর আধাঘণ্টা আগে। যত মানুষ ভেতরে ছিলেন, তার চেয়ে বেশি মানুষ ফিরে গেছেন জায়গা না পেয়ে। মানুষের এই ঢল দেখে আপ্লুত কথাসাহিত্যিক জানালেন তার মুগ্ধতার কথা। বললেন, ‘আপ্লুত বললেও বোধ হয় কম বলা হবে। এখানে এসে, এত মানুষের মুখোমুখি বসে যেন নতুন এক জীবন খুঁজে পেলাম।’

নিজের জীবন ও সৃষ্টির গল্পে প্রবেশ করলেন পাড়ি দেওয়া কঠিন সময়ের স্মৃতিচারণে। বললেন, দুই বছর আগে একদিন লেখালেখি শেষ করে রাতে ঘুমাতে যাই। এর পর যখন ঘুম ভাঙে, তখন নিজেকে আবিস্কার করি হাসপাতালের বিছানায়। যখন আমার স্মৃতিভ্রষ্ট হয়ে যায়, কোনো কিছুই মনে করতে পারছিলাম না। চিকিৎসকরা জানালেন, আমি আমার সব কিছুই ভুলে গেছি। এমনকি আমার নিজের নামটাও।’

এতটুকু বলে একটু থামলেন। আবার শুরু করলেন বলা, ‘বাসায় ফেরার পর আমার হাতে শিশুদের বর্ণপরিচয় বই ও একটি স্লেট তুলে দেওয়া হয়। যাতে আমি নতুন করে অ, আ এবং এ, বি, সি শিখতে শুরু করলাম। প্রথমেই নিজের নাম মনে পড়ল। আস্তে আস্তে সব কিছু মনে পড়তে শুরু করল।’

তিনি আর লিখতে পারবেন না বলে চিকিৎসকরা তাকে জানিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের সে শঙ্কাকে ভুল প্রমাণ করে সমরেশ মজুমদারের কলম চলতে শুরু করে আবার। কীভাবে লেখক হিসেবে তার দ্বিতীয় জীবন শুরু হয়, জানালেন নিজেই। ‘দীর্ঘদিন ধরে আমি ফুলস্কেপ কাগজে প্রতিটি লাইনে ১২টি করে শব্দ লিখতাম। অসুস্থতার পরে যখন লেখা শুরু করি, তখন ৮ থেকে ১০ শব্দ করে ছয় লাইনের বেশি লিখতে পারিনি। ধীরে ধীরে লাইনের সংখ্যা বাড়তে থাকে। অসুস্থ হওয়ার আগে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’র পূজা সংখ্যায় আমার একটি উপন্যাস লেখার কথা ছিল। অনিশ্চিত হয়ে যাওয়া সেই উপন্যাসটি দিয়েই আমি আবার পাঠকদের কাছে ফিরে এলাম। এখন আর কষ্ট হয় না লেখার সময়। দীর্ঘ ২৩ বছর পর আমি এখন ‘দেশ’ পত্রিকায় একটি ধারাবাহিক উপন্যাস লিখছি।’

এর পর তিনি শোনালেন লেখালেখির শুরুর সময়টার গল্প। জানালেন, মঞ্চনাটকের প্রতি তার টান ছিল। যে নাটকের দলে তিনি কাজ করতেন, সেখানে একটি চিত্রনাট্য রচনার জন্য প্রথম গল্প লেখেন। যার নাম ছিল ‘অন্তর আত্মা’। তবে গল্প নিয়ে তারা নাটক না করায় সেটি ‘দেশ’ পত্রিকায় পাঠান তিনি। প্রথমে অবশ্য সেটি ছাপানো হয়নি। বললেন, এরপর আমার বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে ‘দেশ’ পত্রিকার তৎকালীন সম্পাদক বিমল করকে ফোন করে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করলাম। অবশেষে কাগজে গল্পটা ছাপা হয়। সেখান থেকে তাকে ১৫ টাকা দেওয়া হলে বন্ধুদের নিয়ে খাওয়া-দাওয়ার আড্ডায় টাকাটা উড়িয়ে দেন। সেই আড্ডায় কফি ছিল। খাওয়ার লোভে বন্ধু তাকে আবার লিখতে বলেন। সেই কফি খাওয়া ও খাওয়ানোর লোভ থেকেই সাহিত্যিক হিসেবে আবির্ভাব ঘটে সমরেশ মজুমদারের।

বাতিঘরের এই আড্ডায় বারবার উঠে আসে তার উপন্যাসত্রয়ী ‘উত্তরাধিকার’, ‘কালবেলা’ ও ‘কালপুরুষ’-এর প্রসঙ্গ। তিনি বললেন, এই তিনটির মধ্যে প্রথম দুটি অনেকটা জোর করে লেখা। মন থেকে লিখিনি। বলা যেতে পারে, বাধ্য হয়েই লিখেছি। ‘উত্তরাধিকার’ প্রকাশের পরে পাঠকদের আগ্রহের পরে প্রকাশক সাগরময় ঘোষের নির্দেশে বাকি দুটি লেখা হয়।

উঠে আসে ‘সাতকাহনে’র দীপাবলি চরিত্রের কথাও। বললেন, আমার বাড়ির পাশে বারো বছরের একটি মেয়েকে জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়। বিয়ের দিন সকালে সে আমার হাত ধরে বলেছিল, ‘কাকু, আমাকে বাঁচাও’। অনেক চেষ্টা করেও সেদিন মেয়েটির বিয়ে ঠেকাতে পারিনি। তবে বিয়ের আট দিন পর বিধবা হয়ে মেয়েটি ফিরে এসে আমাকে বলেছিল, ‘কাকু, আমি বেঁচে গেলাম’। এখান থেকে দীপাবলি চরিত্রটি তৈরি হয়। আমরা পুরুষরা মেয়েদের ওপর নির্ভরশীল জীবনযাপন করি; কিন্তু দীপাবলি এ ধরনের মেয়ে না। কোনো পুরুষই তাকে স্ত্রী হিসেবে চান না। অন্যদিকে মেয়েরা তাকে জীবনের আদর্শ মনে করে। এটাই এ চরিত্রের সার্থকতা।

এক পাঠক জানতে চাইলেন আত্মজীবনী প্রসঙ্গে। তিনি বললেন, আত্মজীবনী লিখলে ঘরে ও বাইরে শত্রু তৈরি হবে। আমাকে দিয়ে এ ‘কুকার্য’ হবে না। আলাপের এক পর্যায়ে তিনি জানালেন তার স্বপ্নের কথা। বললেন, ত্রিশ বছর ধরে একটি উপন্যাস লেখার কথা ভাবছেন। যেটি শুরু হবে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্টের বিকেল থেকে। যখন ভারত ভাগের মধ্য দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের জন্ম হয়। আর শেষ হবে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনের বিকেলে। এ উপন্যাসের মধ্য দিয়ে তিনি বাঙালির অভ্যুত্থানের গল্প শোনাতে চান। একই সঙ্গে দেশভাগ ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে এক করে একটি আখ্যান রচনা করতে চান।

অনুষ্ঠানে সবাইকে স্বাগত জানান বাতিঘরের কর্ণধার দীপঙ্কর দাস। উপস্থিত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। সবশেষে তিনি বলেন, ঔপন্যাসিকরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মিথ্যাবাদী। তারা কোটি কোটি পৃষ্ঠাজুড়ে যা লেখেন, তার একটিও সত্য নয়। কিন্তু তার ভেতরটা সত্য, স্বপ্নগুলো সত্য। যার প্রমাণ সমরেশ মজুমদার ও তার ভক্তরা। – সমকাল

পোষ্টটি 153বার পঠিত

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন
  • 3
    Shares

Check Also

মার্কিন প্রথিতযশা কবি ই ই কামিংসের জন্ম আজ

বাংলাবাজার২১ : মার্কিন সাহিত্যের একজন প্রথিতযশা কবি ই ই কামিংস। ১৮৯৪ সালের ১৪ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *