Home / Uncategorized / অনুবাদ, ভাষা এবং ভাষাশিক্ষা

অনুবাদ, ভাষা এবং ভাষাশিক্ষা

রাজু আলাউদ্দিন : অনুবাদ আর ভাষাশিক্ষা শুধু সহোদরই নয়, তারা যমজ ভাইয়ের মতো; একে অন্যের প্রতিরূপ। পরিভাষার ভিন্নতার কারণে তাদের যত দূরবর্তীই মনে হোক না কেন, তারা আসলে অভিন্ন রক্তের বন্ধনে সম্পর্কিত। পরিভাষার মুখোশটা সরিয়ে ফেললেই দেখা যাবে তাদের স্পন্দন ও স্বভাবের গভীর সাদৃশ্য।

ভাষা শেখার একেবারে সূচনা থেকেই একটি শিশু যা করে তা আসলে অনুবাদকর্মেরই একটি ধরন। মেক্সিকোর বিখ্যাত কবি ও প্রাবন্ধিক ওক্তাবিও পাস তাঁর Translation : Literature and letters প্রবন্ধে এই দুয়ের চমৎকার একটি সাদৃশ্য তুলে ধরেছেন এভাবে : “When we learn to speak, we are learning to translate; the child who asks his mother the meaning of a word is really asking her to translate the unfamiliar words he already know. In this sense, translation within the same language is not essentially different from translation between two tongues and the histories of all peoples parallel the child’s experience.” অনুবাদ ও ভাষা শিক্ষার সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্কটি আরেকটু বিশদ করে বোঝার জন্য আসুন, আমরা ভাষা ও অনুবাদ—এ দুয়ের স্বভাবটিকে আলাদা করে একটু দেখে নিই।

কবিতা ও এর আশ্রয়দাত্রী ভাষা নিয়ে মার্টিন হাইডেগারের উদ্বেগের কথা আপনাদের অজানা নয়। তাঁর দর্শনের একটি বিরাট অংশই ভাষার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক নিয়ে, এমনকি তাঁর যে বিখ্যাত দর্শনগ্রন্থ Being and time, সেটিও শেষ বিচারে আমাদের কাছে অবোধ্যই থেকে যাবে, যদি ভাষাবিষয়ক হাইডেগারের ধারণাকে আমরা উপেক্ষা করি। কারণ শেষ পর্যন্ত আমাদের সব ভাবুকতা ও চিন্তা আসলে তো ভাষাশ্রয়ী। তিনি তো আমাদের আগেই বলেছিলেন যে ‘ভাষা হচ্ছে সত্তার ঘর।’ সুতরাং আমাদের সত্তাকে বুঝতে গেলে ভাষার স্বভাবটি বুঝতে পারাটা খুবই জরুরি।

আমাদের প্রচলিত ধারণা এই যে ভাষা পরস্পরের মধ্যে যোগাযোগ সৃষ্টি করে। সেটা যে করে তাতে কোনোই সন্দেহ নেই; কিন্তু এই যোগাযোগটা হচ্ছে একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ের এক যোগাযোগ। একেবারেই সরল ও প্রবলভাবে দৃষ্টিগ্রাহ্য কিছু ভৌত বিষয়ের সঙ্গে যোগাযোগ। কিন্তু এর বাইরে আমাদের আরো এমন সব বিষয় রয়েছে, আছে এমন সব ভাবুকতা ও চিন্তার এক জগৎ, যেখানে ভাষা বেশ খানিকটা যোগাযোগের ভূমিকা পালন করলেও, অনেক ক্ষেত্রে অগম্য ও অবোধ্য বলে ভাষা তখন নিরর্থক হয়ে ওঠে। আমরা ভাষার সাহায্যে তাকে যতই বোঝার চেষ্টা করি না কেন, তার কোনো সুরাহা হয় না শেষ পর্যন্ত; বরং তা কখনো কখনো আরো বেশি জটিল হয়ে ওঠে। চর্যাপদের তান্ত্রিক কবি কাহ্নপা ভাষার এই সীমাবদ্ধতা লক্ষ করে হাজার বছর আগেই বলেছিলেন যে—

আলেঁ গুরু উএসই সীস
বাক পথাতীত কহিব কীস
জেতই বোলী তেতবি টাল

ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ইংরেজি অনুবাদে এই কথাগুলোর বোধগম্য রূপটা হচ্ছে এ রকম—

How can he speaks of which is beyond the reach of the way of speech?

The more it was said; the more it was a subterfuge.

মার্টিন হাইডেগারের মতো আরো একজন জার্মান দার্শনিক লুডভিগ ভিটগেন্টাইন ভাষার সীমাবদ্ধতা নিয়ে একই রকম উদ্বেগ প্রকাশ করে চর্যাপদের কবির ওই উক্তিকে আরো বিস্তৃত রূপ দিতে গিয়ে অনেকটা প্রতিধ্বনি করে বলেছিলেন : What we can not speak about we must pass over in silence. এবং এই সীমাবদ্ধতার কারণ হিসেবে বলেছেন : Language disguises thought. So much so that the outward form of the clothing it is impossible to infer the form of the thought beneath it, because the outward form of the clothing is not designed to reveal the form of the body, but for entirely different purpose.

তার মানে ভাষাকে আমরা যতটা সহজ ও প্রকাশের বাহন বলে মনে করি, কখনো কখনো তা বিপরীত স্বভাবেও হাজির হয়। আরো একটি বিষয়ও এখানে উল্লেখ করা উচিত, যা হাইডেগার ভাষা সম্পর্কে বলেছিলেন : Language itself is poetry in the essential sense. আমাদের ধারণা ছিল, আমরা ভাষার আশ্রয়ে কাব্য রচনা করি; কিন্তু হাইডেগার আমাদের ভাষার মর্মে দেখিয়ে দেন, যে ভাষার সাহায্যে আমরা কাব্য রচনা করি, সেই ভাষা নিজেই আসলে কাব্যিক স্বভাবের অন্তর্গত। সেটি কিভাবে? প্রতিটি শব্দই হচ্ছে কাব্যিক কর্মকাণ্ডের চিহ্নস্বরূপ। তিনি এটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছিলেন যে আমরা যখন কোনো বস্তুর নামকরণ করি, তখন সেটি এক কাব্যিক কর্ম, এক সৃজন। ‘আম’ শব্দটি নিশ্চয়ই আগে ছিল না, কিন্তু যখনই কেউ এই ফলটিকে আম বলে অভিহিত করলেন, তখনই তিনি কবির ভূমিকাটি পালন করলেন। কবির কাজ এমন এক সংবেদনকে প্রকাশ করা, যা আগে ছিল না। যদিও সে প্রচলিত শব্দগুলো ব্যবহারের মাধ্যমে সেই কাজটি করেন; কিন্তু নতুন কোনো শব্দ সৃষ্টি না করেও তিনি সেই কাজটি করেন শব্দের অর্থান্তর ঘটিয়ে।

আমরা এখন নিশ্চয়ই এটা বুঝতে পারছি যে ভাষাকে যতটা সহজ বলে মনে করছি, ভাষা ততটা সরলরেখায় চলে না। তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে, আমরা এই অদ্ভুত স্বভাবের ভাষাকে তাহলে কিভাবে আয়ত্ত করি বা কতটুকু আয়ত্ত করি। এখানেই ভাষা শেখার প্রশ্নটি গুরুতর হয়ে ওঠে। যেকোনো ভাষা, এমনকি নিজের মাতৃভাষাটিও আসলে আমরা কতটুকু শিখি? আমরা বেশির ভাগ লোকই শুধু ভাষার কঙ্কালটাই নাড়াচাড়া করি, এর রক্তমাংসময় আত্মার গহনে প্রবেশ করি খুব কমই। কিন্তু কবিকে এই গহনে প্রবেশ করতে হয়। আর এটা করতে গিয়ে তিনি ভাষার অদ্ভুত স্বভাবের মুখোমুখি হন। ভাষার শরীর থেকে অব্যবহারের ধুলাবালি সরিরে তিনি এর পুনর্বিন্যাস করেন, পুনর্বিন্যাস তাঁকে করতে হয় তাঁর নতুন অনুভূতি ও সংবেদনকে প্রকাশের স্বার্থে।

অনুবাদকের সঙ্গে ভাষার বা ভাষা শেখার সম্পর্কটা তাহলে কী রকম? সাদা চোখে আমরা কেউই অনুবাদককে কবি বলি না। বলি না ভাষার শিক্ষকও। কিন্তু তিনি সূক্ষ্ম বিচারে আসলে এ দুটি ভূমিকাই পালন করেন। আসুন আমরা অনুবাদকের ভূমিকাটি বোঝার সুবিধার্থে ওক্তাবিও পাসের হাত ধরে ভাষার স্বভাব ও কর্মকাণ্ডটুকু আরেকবার দেখার চেষ্টা করি| Language itself is a translation : each word and each phrase explains (translates) what other words and phrases mean. Speech is continual translation within the same language. তার মানে আমরা যখন কথা বলি, তখন আসলে অনুবাদই করি। আমরা চাই বা না চাই, জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে ভাষা ব্যবহারকারী প্রতিটি মানুষই অনুবাদক। এবং ভাষা যে মূলত এক অনুবাদকর্ম, সেটি আরো বিশদ করে ওক্তাবিও পাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, Each text is unique yet at the same time it is the translation of another text. No text can be completely original because language itself, in its very essence, is already a translation—first from the nonverbal world and then because each sign and each prhase is a translation of another sign, another phrase. এই অর্থে আমরা সবাই অনুবাদক হলেও সত্যিকারের অনুবাদক নামধারী ব্যক্তিটির কাজ ভাষার গভীর স্তরে অবগাহন করা। আমার বিবেচনা এই যে ভাষার সত্যিকারের সম্প্রসারণ, সম্ভাবনা ও পুনর্বিন্যাস ঘটে—গল্পকার, ঔপন্যাসিক ও প্রাবন্ধিকের হাতে ততটা নয়, যতটা ঘটে কবি ও অনুবাদকের হাতে। কবির হাত দিয়ে কেন ঘটে, সেটা আগেই উল্লেখ করেছি; কিন্তু অনুবাদকের হাতে কিভাবে ঘটে, সেটা আমরা বরং লক্ষ করব এখন। অনুবাদকের কাজ হলো ভাষা সম্পর্কে আমাদের অনুভূতি বা সংবেদনশীলতাকে তীব্রতর করে দেওয়া, কবিরা যে কাজটি সাহিত্যের অন্য এক শাখা থেকে করে থাকেন। ভাষার প্রশ্নে কবি ও অনুবাদক যে অভিন্ন একবিন্দুতে অবস্থান করেন, সেটি উপলব্ধি করেই শার্ল বোদলেয়ার বলেছিলেন—Poets are translators.

প্রতিটি ভাষাই স্বতন্ত্র এবং উৎস ভাষার লেখাটিও একটি স্বতন্ত্র রচনাকর্ম। আলোচনার সুবিধার্থে এ ক্ষেত্রে একটি কবিতাকেই উদাহরণ হিসেবে নেওয়া যাক। কবিতাকে উদাহরণ হিসেবে নেওয়ার কারণ, কবিতার মধ্যে ভাষার ঘনীভূত রূপ, ভাষার অসম্পূর্ণতা, নতুন কোনো অনুভূতি বা সংবেদনের সাংকেতিক রূপটি ফুটে ওঠে প্রথম। এই ফুটে ওঠার অংশ হিসেবে কবিতাটি উৎস ভাষাকেই আসলে নানাভাবে সংঘর্ষের মধ্যে ফেলে নতুন এক চাপ সৃষ্টি করে আরেকটি ভাষা হয়ে ওঠে। কবির সৃষ্ট এই ভাষাটি তাঁর স্বভাষীদের কাছে যেমন নতুন, তেমনি অন্য ভাষার অনুবাদকের কাছেও নতুন।

একজন অনুবাদক যখন উৎস ভাষার এই কবিতা অনুবাদ করতে যাবেন, তখন তাঁকে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। যেহেতু প্রতিটি ভাষাই অসম্পূর্ণ, তাই নিজের ভাষাকেও ওই কবিতার উপযোগী করে নিতে হয় অনুবাদককে। কবিতা যেহেতু অবভাস, সংকেত ও আলংকারিক উপাদানের পরোক্ষ প্রতিনিধি, তাই অনুবাদকের কাছে তা আরো বেশি চ্যালেঞ্জিং। যেহেতু টার্গেট ভাষাটি নতুন এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছে, তাই অনুবাদক মূলের টেকচার, কাঠামো, বাচনিক কৌশল ও অর্থের সৌরভ রক্ষার্থে ভাষাকে তাঁর নতুনভাবে বিন্যাস করে নেওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় থাকে না। এই নতুন বিন্যাসের ফলে অনুবাদক ভাষার সম্ভাবনাকে বিস্তৃত করেন। ভাষাকে স্বরচিত কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার উসকানি দেন। ঠিক এইখানটাতেই অনুবাদকের সঙ্গে ভাষার মুক্তির সম্পর্কটি তৈরি হয়ে ওঠে। অনুবাদের মাধ্যমে অনুবাদক নিজের ভাষায় এক বিশুদ্ধ রূপের সন্ধান করেন এবং কখনো কখনো তা অর্জনও করেন। বিখ্যাত জার্মান লেখক ওয়ান্টার বেনজামিন তাঁর The task of a translator নামের এক অসামান্য প্রবন্ধে এই ব্যাপারটি চমৎকার পর্যবেক্ষণের সঙ্গে তুলে ধরেছেন— ‘বিশুদ্ধ ভাষার খোঁজে মুক্ত অনুবাদ লক্ষ্য (Target) ভাষাতেই আরেকটি বিশুদ্ধ ভাষা তৈরি করে। অনুবাদকের কাজই হচ্ছে লক্ষ্য ভাষায় সেই বিশুদ্ধ ভাষাকে মুক্তি দেওয়া, যেটি উৎস ভাষার মোহে আবদ্ধ ছিল। এভাবে অনুবাদক পুনর্সৃষ্টির মাধ্যমে বন্দি থাকা বিশুদ্ধ ভাষাকে লক্ষ্য ভাষায় মুক্তি দেন। বিশুদ্ধ ভাষার খোঁজে তিনি লক্ষ্য ভাষার অবক্ষয়ী বাধাগুলো ভাঙেন।’

“For the sake of pure language, a free translation bases the test on its own language. It is the task of the translator to release in his own language that pure language which is under the spell of another, to liberate the language imprisoned in a work in his re-creation of that work. For the sake of pure language he breaks through decayed barriers of his own language.” (p-80)

বেনজামিনের এই পর্যবেক্ষণে যদি ঈমান রাখা যায়, তাহলে মানতেই হবে যে অনুবাদকের কাজ নিছক অনুবাদ করাই নয়, অনুবাদের মাধ্যমে তিনি আসলে ভাষার জগতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ভাষাকে তিনি বিশুদ্ধ করেন, ভাষার সীমানাকে তিনি সম্প্রসারিত করেন। এভাবে অনুবাদক হয়ে ওঠেন ভাষার এক মহান শিক্ষক। কিন্তু বাংলাদেশের সৃজনশীল পরিমণ্ডল অজ্ঞতায় সমৃদ্ধ বলে এই মহান শিক্ষককে উপেক্ষা ও অবহেলা করা হয়। তথাকথিত মৌলিকতার মৌলবাদী প্রবক্তারা অনুবাদককে বিবেচনা করেন গৌণ এক ব্যক্তি হিসেবে। – কালের কণ্ঠ

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন

Check Also

রুদ্র অয়নের কবিতা “মনুষ্যত্ত্ব”

হিংসা নয়, দ্বন্দ্ব নয় নয় খুন হত্যা, ফুল হয়ে ফুটুক সবার মানবিক সত্ত্বা। ধর্মের পূর্ণতা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *