বৃহস্পতিবার , ফেব্রুয়ারি ২০ ২০২০
Home / সাহিত্য / স্মৃতিকথা / নিজের অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন হার্তা মুলার
কথাসাহিত্যিক হার্তা মুলার

নিজের অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন হার্তা মুলার

দুলাল আল মনসুর : কথাসাহিত্যিক হার্তা মুলার। জন্ম রোমানিয়ায়। তবে তিনি একজন জার্মান ঔপন্যাসিক। মাতৃভাষা জার্মান; অবশ্য পরে তিনি গ্রামার স্কুলে রোমানীয় ভাষা শেখেন। গত শতকের নব্বইয়ের দশক থেকে তাঁর আন্তর্জাতিক পরিচিতি বাড়তে থাকে। তাঁর লেখা ২০টির অধিক ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তিনি ২০০৯ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। সাহিত্যকর্মের প্রশংসা করে নোবেল কমিটির তরফে বলা হয়, তিনি ‘কাব্যিক মনোনিবেশ নিয়ে প্রাণখোলা গদ্যে সব হারানোদের ভূখণ্ডের চিত্র আঁকেন।’

বয়স ৩২ বছর পর্যন্ত রোমানিয়ায়ই ছিলেন। প্রথম বই ‘লোল্যান্ডস’সহ আরো কিছু লেখা রোমানিয়ায় থাকতেই লিখেছিলেন। এ উপন্যাসের পটভূমি পশ্চিম রোমানিয়ার বানাত এলাকা। এখানে এবং আরো অনেক লেখায় প্রধান বিষয় হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে স্বৈরাচার। এ প্রসঙ্গে মুলার বলেন, ‘আমি আর কিছু সম্পর্কে জানতাম না। আর কিছু দেখার অভিজ্ঞতা আমার ছিল না। সে জন্য আমি এ বিষয় নিয়েই লিখে গেছি। আমি জানি, এ রকম সাহিত্য সারা পৃথিবীতেই আছে। এ রকম সাহিত্যে কোনো চরম ঘটনার সঙ্গে কারো কারো জীবনের ঘটনার সমান্তরাল উপস্থাপনা থাকে। যেমন ১৯৫০-এর দশকে পূর্ব ইউরোপে গুলাগের চিত্র ছিল ভিন্ন ভিন্ন চেহারায়; কিংবা লেবার ক্যাম্পের কথা বলা যায়, অন্যদিকে হিটলারের সময়ের ইহুদিনিধনও স্মরণ করার মতো। অনেক লেখক এসব বিষয়ের বর্ণনা হাজির করেছেন তাঁদের নিজেদের জীবনের সমান্তরালে। আমার বিশ্বাস, এ রকম সাহিত্য কিউবা থেকে চীন—সর্বত্রই আছে।

চসেস্কুর দমনমূলক শাসনামলের সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র রোমানিয়ার পটভূমিতে মুলারের লেখায় উঠে আসে অত্যাচার, নির্যাতন, নিষ্ঠুরতা, ত্রাস—এসব। নিজের অভিজ্ঞতায় সে সময়ের অবস্থা ভালো করে দেখা ছিল বলেই তাঁর পক্ষে এগুলো নিয়ে লেখা সহজ হয়েছে। অনেক লেখা রোমানিয়ায় জার্মান সংখ্যালঘুদের দৃৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা হয়েছে। যেমন—উপন্যাস ‘দ্য হাঙ্গার অ্যাঞ্জেলে’ রোমানিয়ার জার্মান সংখ্যালঘুদের রোমানিয়ায় সোভিয়েত দখলদারির সময়ের চিত্র দেখানো হয়েছে। ১৯৪৫ সালে এবং তার পরে জার্মান সংখ্যালঘুদের সোভিয়েত ইউনিয়নে ‘জবরদস্তি শ্রমে’ পাঠানো হয়। হার্তা মুলারের মা ১৭ থেকে ২২ বছর বয়স পর্যন্ত পাঁচ বছর সোভিয়েত ইউনিয়নে এ রকম জবরদস্তিমূলক শ্রম দিতে বাধ্য হন। তাঁদের গ্রামের এবং রোমানিয়ায় জার্মান সম্প্রদায়ের অনেক পরিবারের সদস্যদের এ রকম অভিজ্ঞতা হয়। ছোটবেলার এ রকম অভিজ্ঞতা যেহেতু তাঁর লেখার ওপর প্রভাব ফেলে, তিনি বলেন, ‘ওই সব দিনের ঘটনা আমার বাল্যবেলার স্মৃতির মধ্যে ঢুকে পড়ে। হয়তো ছোটবেলায় কারোরই এ রকম ঘটনাকে রাজনৈতিক দৃষ্টিতে দেখার ক্ষমতা থাকে না। কিন্তু কথায় না হলেও মনের ভেতর সেগুলো গেঁথে থাকে।’

তাঁর ওপর প্রভাব প্রসঙ্গে কোনো ব্যক্তি কিংবা বিশেষ কোনো বইয়ের কথা বলেননি, তবু বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে জার্মান ও রোমানীয় সাহিত্য পাঠের কথা স্বীকার করেছেন। এ দুটি ভাষার সাহিত্য তাঁর লেখার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। জার্মান ও রোমানীয় ভাষার পার্থক্য তাঁর দৃষ্টি কেড়েছিল। যেসব অভিজ্ঞতার কথা সাবেক স্বামী ঔপন্যাসিক রিচার্ড ওয়াগনারের সঙ্গে লেনদেন করেন। সেগুলোও লেখার চেহারা তৈরিতে ভূমিকা রাখে। দুজনই রোমানিয়ায় বড় হয়েছেন, একই রকম জাতিগত আবহের অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন এবং দুই দেশের, দুই ভাষার সাহিত্য পাঠ করেছেন। দুজনই জার্মান ভাষার শিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন। বাকস্বাধীনতার জন্য লড়াই করা সংগঠন অ্যাকশন গ্রুপ বানাতের সঙ্গে জড়িত ছিলেন দুজনই।

গোপন পুলিশের হাতে অ্যাকশন গ্রুপ বানাতের সদস্যরা অনেক অত্যাচারের শিকারও হন। পুলিশের অত্যাচারের প্রসঙ্গ উঠলে রোমানীয়রা জার্মান সদস্যদের বলেন, বিপদ হলে জার্মানরা তাঁদের দেশে ফিরে যেতে পারবেন; কিন্তু তাঁদের তো রোমানিয়া ছেড়ে কোথাও যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে অ্যাকশন গ্রুপ বানাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকার কারণেই লেখক হিসেবে মুলার সাহস সঞ্চয় করতে পারেন। রোমানিয়ার গোপন পুলিশের হুমকি মাথায় নিয়েই তিনি সাহসী উচ্চারণে তৈরি করতে থাকেন একেকটি লেখা। সে কারণেই তাঁর লেখা কথাসাহিত্য হলেও প্রধানত বাস্তব-অভিজ্ঞতার এতটা কাছাকাছি। – কালের কণ্ঠ

পোষ্টটি 139বার পঠিত

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন

Check Also

রুদ্র অয়নের গল্প “কালো ছেলে”

টিউশনি করানোর চতুর্থ দিনের মাথায় ছাত্রীর মা অনিককে ডেকে হাতে কিছু টাকা দিয়ে বলল, ‘কাল …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *